আগরতলা, ২০ আগস্ট:১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে রক্তদান কর্মসূচি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের জবাব দিতে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন বিধানসভার উপাধ্যক্ষ তথা সংশ্লিষ্ট এলাকার বিধায়ক রামপ্রসাদ পাল। তাঁর অভিযোগ, স্বাধীনতা দিবসে রক্তদান কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া কিংবা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে কোনও ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। বরং ভুল বোঝাবুঝি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপাধ্যক্ষ তথা বিধায়ক দাবি করেন, ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা নাগাদ সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক তথা বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর বিধানসভা এলাকায় ১৫ আগস্ট উপলক্ষে রক্তদান কর্মসূচি করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি জানার পর তিনি খোঁজ নিয়ে জিতেন্দ্র চৌধুরীকে জানান, কর্মসূচি করতে কোনও বাধা নেই এবং প্রয়োজনে তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
রামপ্রসাদ পালের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই রাতেই তিনি ফের জিতেন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং পরদিন কর্মসূচি করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। তাঁর দাবি, তখন বিরোধী দলনেতা তাঁকে জানান, কর্মসূচিটি ইতিমধ্যেই বাতিল করা হয়েছে। পরে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কর্মসূচি করার কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন বিধায়ক।
রামপ্রসাদ পালের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল। রক্তদান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা হলেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন বা রক্তদানে বাধা দেওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি। তাঁর দাবি, কিছু বিচ্ছিন্ন বক্তব্য ও ভিডিও সম্পাদনা করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ঘটনাটিকে অন্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
উপাধ্যক্ষ তথা স্থানীয় বিধায়ক আরও দাবি করেন, প্রথমদিকে সিপিআইএমের পক্ষ থেকে ১০-১২ জন রক্তদানের কথা বলা হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা কর্মসূচিটি আরও বড় আকারে করার প্রস্তাব দেন। তাঁর অভিযোগ, যুব মোর্চা এবং স্থানীয়রা বলেছিল স্বাধীনতা দিবসের দিন এটি এলাকার একটি অনুষ্ঠান হিসেবে রক্তদান শিবির করা হোক। এটিকে যেন রাজনৈতিক রং দেওয়া না হয়। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি নবারুণ দেব।
সাংবাদিক সম্মেলনে রামপ্রসাদ পাল সিপিআইএমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, মানিক সরকার ও সিপিআইএমের কিছু নেতা-কর্মী মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি সিপিআইএমের কর্মীদের ‘অস্ত্র হাতে নেওয়ার’ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি এর তীব্র সমালোচনা করেন।এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বিধায়ক বলেন, রাজ্যের মানুষ সিপিআইএমের দীর্ঘ শাসনকাল এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাক্ষী। তাঁর অভিযোগ, সিপিআইএম আবারও যদি অস্ত্র ও হিংসার রাজনীতির দিকে ফিরে যেতে চায়, তাহলে তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমের যুগে মানুষ অনেক বেশি সচেতন। ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করিয়ে রাখার রাজনীতি আর চলবে না।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে সরাসরি নিশানা করেন বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ ২৫ বছরের বাম শাসনের পরও মানিক সরকার বর্তমান রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, অথচ তাঁর শাসনামলে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল, তা মানুষ ভুলে যায়নি।
রামপ্রসাদ পালের দাবি, বাম আমলে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর অত্যাচার, ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক হিংসার একাধিক ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর অভিযোগ, বিশেষ করে তাঁর বিধানসভা এলাকার কিছু অংশে সিপিআইএমের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের প্রভাব এতটাই ছিল যে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারতেন না।
তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর বিধানসভা এলাকায় বাম আমলে উন্নয়নও যথেষ্ট পিছিয়ে ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে এলাকায় প্রায় ৬০টি রাস্তার প্রয়োজন ছিল, সেখানে মাত্র কয়েকটি রাস্তা ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে তাঁর মেয়াদে প্রায় ২০-২৫টি রাস্তা নির্মাণ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর দাবি, সিপিআইএমের শাসনামলে বিরোধীদের উপর রাজনৈতিক চাপ ও সন্ত্রাসের পরিবেশ ছিল। বক্তব্যের এক পর্যায়ে অতীতের রাজনৈতিক হিংসা ও কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রসঙ্গও তোলেন রামপ্রসাদ পাল।তাঁর অভিযোগ, বাম আমলে তাঁর বিধানসভা এলাকার একটি পঞ্চায়েতকে ঘিরে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছিল এবং রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারীদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ ছিল।
তিনি কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও পুরনো রাজনৈতিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেন, সিপিআইএমের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা বিরোধীদের ভয় দেখাতেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতেন।
রামপ্রসাদ পালের আরও অভিযোগ, সিপিআইএমের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে চাইছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে বিজেপি ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে এবং যুব সংগঠনগুলির কর্মীদেরও রাজনৈতিকভাবে উত্তেজিত করা হচ্ছে।
তবে একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁর দলও কোনও ধরনের রাজনৈতিক হিংসা চায় না। গণতান্ত্রিক পরিবেশে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে নিজের কর্মসূচি করার অধিকার দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিআইএমকে সতর্ক করে বিধায়ক বলেন, রাজ্যে কোনওভাবেই রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত নয়। তাঁর কথায়, প্রত্যেক রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করুক, কিন্তু হিংসা বা অস্ত্রের রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, ১৫ আগস্টের মতো জাতীয় দিবসকে রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয় না করে সকলের উচিত ছিল ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করা।
সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে উপাধ্যক্ষ তথা স্থানীয় বিধায়ক রামপ্রসাদ পাল দাবি করেন, রক্তদান কর্মসূচি বাতিল করার সিদ্ধান্ত সিপিআইএমের পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর পক্ষ থেকে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরারও আবেদন জানান তিনি।
























