‘আত্মসমর্পণ নয়, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতি’: পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ভারতের ‘নীরবতা’ প্রসঙ্গে সোনিয়ার পর সুর শশী থারুরের

নয়াদিল্লি, ১৯ মার্চ: পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিয়ে ভারতের কূটনৈতিক নীরবতাকে ‘নৈতিক ব্যর্থতা’ বলে যে সমালোচনা উঠেছে, তার জবাবে কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর একে ‘দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতি’র অংশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এটি আত্মসমর্পণ নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত সম্পর্ককে মাথায় রেখে নেওয়া বাস্তববাদী অবস্থান।

সংবাদে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে থারুর লিখেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী হতে পারে, কিন্তু ভারতের বিদেশনীতি কেবল নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেখানে বাস্তববোধ, জাতীয় স্বার্থ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

থারুর লেখেন, গত কয়েক সপ্তাহে বহু ভারতীয় উদারপন্থী সরকারের নীরবতার সমালোচনা করে একে ‘নৈতিক ভীরুতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভারতের এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের জঘন্য লঙ্ঘন বলে প্রকাশ্যে নিন্দা করা উচিত ছিল। তবে থারুরের মতে, এই দাবির মধ্যে এক ধরনের আত্মঘাতী রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে।

এই মন্তব্য এমন এক সময় সামনে এল, যখন কংগ্রেসেরই একাংশ কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নীরবতা’ নিয়ে সরব হয়েছে। কয়েক দিন আগে কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধীও এই বিষয়ে কেন্দ্রের অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়, বরং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নামান্তর।

সংবাদে প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধ “ইরানি নেতার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়, এটি দায়িত্বের অবহেলা।”-এ সনিয়া গান্ধী লিখেছিলেন, আলোচনার মধ্যেই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান নেতাকে হত্যা করা সমকালীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুতর অভিঘাত। কিন্তু এই ঘটনার থেকেও বেশি চোখে পড়ছে নয়াদিল্লির নীরবতা।

এর জবাবে থারুর স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ন্যায্য নয়। ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান— সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, আগ্রাসনবিরোধিতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের নীতি— এই যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমনকি ‘প্রি-এম্পটিভ সেল্‌ফ-ডিফেন্স’-এর যুক্তিও এখানে খাটে না বলে তাঁর মত।

তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের দ্রুত শোকপ্রকাশ করা উচিত ছিল, যেমনটি আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হলে করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অভাব সত্ত্বেও সরকারের নীরবতাকে তিনি সরাসরি দোষারোপ করতে চান না।

নেহরুর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখ টেনে থারুর বলেন, জোটনিরপেক্ষতা কখনও নৈতিক অবস্থান না নেওয়ার নীতি ছিল না; বরং তা ছিল ঠান্ডা লড়াইয়ের সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল। আজকের বহুমেরু বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ভারত ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’-এর নীতি মেনে নানা শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, যদিও তারা অনেক সময় একে অপরের বিরোধী অবস্থানে থাকে।

তাঁর কথায়, ভারতের মূল লক্ষ্য একই রয়েছে— সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিশ্ব ন্যায়বিচারের পক্ষে সওয়াল করা। কিন্তু সেই আদর্শ প্রয়োগ করতে হবে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে, আত্মতৃপ্তিকর নিন্দাবর্ষণের মাধ্যমে নয়।

থারুর আরও মনে করিয়ে দেন, অতীতেও ভারত নীতিগত অবস্থান ও কৌশলগত স্বার্থের সংঘাতে অনেক সময় সংযম দেখিয়েছে। ১৯৫৬-তে হাঙ্গেরি, ১৯৬৮-তে চেকোস্লোভাকিয়া এবং ১৯৭৯-এ আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের সময় ভারত যে প্রকাশ্য সংঘাতে যায়নি, তা সোভিয়েত আগ্রাসনের সমর্থন ছিল না; বরং সম্ভাব্য মূল্য বুঝে সতর্ক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁর মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ বা ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।

পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের গভীর স্বার্থের কথাও উল্লেখ করেছেন থারুর। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবছর প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এই অঞ্চলের মাধ্যমে হয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই উপসাগরীয় তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয়র জীবন-জীবিকা এবং তাঁদের পাঠানো অর্থও ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তাঁর যুক্তি, এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ নিন্দা জানালে ভারতের একাধিক কৌশলগত সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাতে বিপন্ন হতে পারে ভারতীয় পরিবারগুলোর রেমিট্যান্স, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ। তাই এই নীরবতা ভীরুতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক বাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি একটি ঠান্ডা মাথার স্বীকৃতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের প্রসঙ্গ টেনে থারুর বলেন, আজকের আমেরিকা আন্তর্জাতিক আইনকে সবসময় প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয় না। ট্রাম্প নিজের লক্ষ্যপূরণে বাধা এলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতেও পিছপা হন না। তাই ভারতের পক্ষে এমন একটি সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে অকারণে উত্তপ্ত করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তাঁর মতে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং চিনের উত্থান নিয়ে যৌথ উদ্বেগ— সব কিছুর জন্যই স্থিতিশীল ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে নীতিবাদী ভাষণে ওয়াশিংটনকে আক্রমণ করলে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর কথায়, “জোরালো বক্তৃতা তখনই মানায়, যখন হাতে যথেষ্ট প্রভাব থাকে।”

থারুর জোর দিয়ে বলেন, বিদেশনীতি মূলত সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সমৃদ্ধির সন্ধান এবং শান্তি বজায় রাখার শিল্প। আত্মতৃপ্তির জন্য উচ্চকিত অবস্থান নেওয়া নয়, বরং পরিণতি বিচার করে পদক্ষেপ করাই এখানে প্রধান। বর্তমান বাস্তবতায় ভারত সেই পরিণতি সহজে সামলাতে পারবে না বলেই তাঁর মন্তব্য।

তিনি আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করা মানেই আত্মসমর্পণ নয়। ভারত বহুপাক্ষিক মঞ্চে বরাবরই বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলেছে, কিন্তু কখন কোথায় সংযম দেখাতে হয়, তাও জানে। এই ভারসাম্যই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির আসল পরিচয়।

সমালোচকদের একহাত নিয়ে থারুর লেখেন, যারা যুদ্ধের নিন্দা না করাকে নৈতিক সাহসের অভাব হিসেবে দেখছেন, তাঁরা আসলে নৈতিক চরমপন্থাকেই সাহস বলে ভুল করছেন। বিদেশনীতি কোনও একাডেমিক আলোচনা নয়; এখানে নীতি ও শক্তির সংঘাতে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার প্রভাব পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে।

গান্ধী ও নেহরুর উত্তরাধিকার প্রসঙ্গেও থারুর বলেন, গান্ধী নৈতিক প্রতিবাদের শক্তির কথা শিখিয়েছেন, নেহরু আন্তর্জাতিক আইনকে শান্তির ভিত্তি বলে দেখিয়েছেন, কিন্তু দু’জনেই জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনীয়তা বুঝতেন। তাঁদের উত্তরাধিকার কঠোর মতবাদ নয়, বরং সময় অনুযায়ী মূল্যবোধের বিচক্ষণ প্রয়োগ।

সবশেষে থারুরের বক্তব্য, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অন্যায্য হলেও ভারতের নীরবতা সেই যুদ্ধের সমর্থন নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তববোধ, যা বলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন সংযম, হঠকারিতা নয়।

তাঁর কথায়, “সংযমই শক্তি”— কারণ সেটাই শেখায় কীভাবে মূল্যবোধ ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে, দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে, এক বিপজ্জনক বিশ্বে বিচক্ষণতার সঙ্গে পথ চলতে হয়।

Leave a Reply