সমাজের নারীরাই হচ্ছে উন্নয়নের এক নীরব স্থপতি: উপরাষ্ট্রপতি

আগরতলা, ৮ মার্চ: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশে নারীশক্তির উন্নয়নের এক নতুন দিশা তৈরি হয়েছে। নারীশক্তির এই উন্নয়নে স্বসহায়ক দলগুলি অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে। স্বসহায়ক দলের মাধ্যমে একজন সাধারণ মহিলাও আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্বে পরিণত হয়ে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আজ হাঁপানিয়াস্থিত আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণের অডিটোরিয়ামে রাজ্যের মহিলা স্বসহায়ক দলের সদস্যা এবং লাখপতি দিদিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণাণ একথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাস নারীশক্তির অবদান ছাড়া অসম্পূর্ণ। গত দশক থেকে দেশে উন্নয়নের এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজের নারীরাই হচ্ছে উন্নয়নের এক নীরব স্থপতি। জাতীয় উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মাইলফলক হল লাখপতি দিদি তৈরি হওয়া।

কেন্দ্রীয় সরকার ১০ কোটি মহিলাকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত করছে। এরমধ্যে ২ কোটিরও বেশি মহিলা লাখপতি দিদি হয়ে উঠছেন। দ্যা শিখো দিদি প্ল্যাটফর্মে ৮ হাজারেরও বেশি মহিলা প্রশিক্ষণের জন্য নথিভুক্ত হয়েছেন, তাতে বোঝা যায় মহিলারা লাখপতি দিদি হতে কতটা আগ্রহী। উপরাষ্ট্রপতি বলেন, আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে ত্রিপুরায় স্বসহায়ক দলের প্রায় ৫ লক্ষ সদস্য-সদস্যা রয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে রাজ্যে লাখপতি দিদি তৈরি করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তাতেও সফলতা আসছে।

উপরাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে দেশের উন্নয়ন কেবলমাত্র সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ প্রদানের মাধ্যমেই সম্ভব। গত ১০ বছরে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা হোক বা জল জীবন মিশন প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই মহিলা সুবিধাভোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষিতে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে নমো ড্রোন দিদির প্রকল্প সূচনা করা হয়েছে। মহিলারা বর্তমানে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিক কৃষি বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন করছেন। উপরাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের প্রায় ৭ কোটি মহিলা আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরে এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। নারীশক্তি বন্দন অধি-নিয়ম দেশের নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপ নিশ্চিত করে যে নারীরা কেবল গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকারী নন, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের শক্তিশালী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।

অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেডি নান্নু বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের লাখপতি দিদি প্রকল্পটির মাধ্যমে একজন মহিলা শুধু তার পরিবারকে উন্নত করেননা পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিয়ে থাকেন। স্বসহায়কদলের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বাজারে বাজারজাতও করা হচ্ছে। এখানে স্বসহায়ক দলের সদস্যদের দ্বারা প্রদর্শিত স্টলগুলি কেবল পণ্যের প্রদর্শনই নয়, এইগুলি ত্রিপুরার আত্মার প্রতিফলনকারী আয়না। স্বসহায়ক দলের উৎপাদিত পণ্যগুলি ত্রিপুরার ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরতে রাজ্য সরকার সচেষ্ট রয়েছে। আমরা প্রতিটি দিদিকে কেবল একজন পণ্য উৎপাদনকারী হিসেবে নয়, বরং একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও দেখতে চাই যিনি তার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে ব্যাবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন। রাজ্যপাল বলেন, দেশ বা রাজ্যের উন্নয়নে মহিলা স্বশক্তিকরণ অত্যন্ত প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার মহিলা স্বশক্তিকরণের লক্ষ্যে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করছে। আসুন আমরা বিশ্বকে দেখাই যে রাজ্যের মহিলারা কেবল আমাদের সংস্কৃতির রক্ষক নয়, বরং আমাদের অর্থনীতির চালিকা শক্তিও।

অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা বলেন, আজকেরদিনটি রাজ্যবাসীর জন্য এক আনন্দের দিন। দেশের উপরাষ্ট্রপতি তার ব্যস্ততম সময়ের মধ্যেও রাজ্যের স্বসহায়ক দলের দিদিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ করার জন্য রাজ্যবাসীর পক্ষ থেকে উপরাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী মহিলাদের আর্থ সামাজিক মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে কাজ করছে। রাজ্য সরকারও প্রধানমন্ত্রীর মার্গদর্শনে রাজ্যের মহিলাদের স্বশক্তিকরণে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করছে। রাজ্য সরকার মহিলা স্বশক্তিকরণের লক্ষ্যে সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ, সরকারি মার্কেট স্টল প্রদানে মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ, কলেজস্তর পর্যন্ত পড়াশুনার ক্ষেত্রে সমস্ত ধরণের ফি মুকুব, মুখ্যমন্ত্রী কন্যা আত্মনির্ভর যোজনায় দ্বাদশ শ্রেণী পাশ মেধাবী ছাত্রীদের বিনামূল্যে স্কুটি প্রদান ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত দিনে রাজ্যের মহিলারা নানাদিক দিয়ে অবহেলিত ছিল।

বর্তমান রাজ্য সরকার রাজ্যের মহিলাদের নানাভাবে মর্যাদা প্রদান করে সমাজের নানাক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে মহিলাদের স্বসহায়ক দলের সঙ্গে যুক্ত করানো হচ্ছে। তাদের মাধ্যমেই নতুন ত্রিপুরা গঠনের দিকে এগুচ্ছে রাজ্য।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের গতির দিকে লক্ষ্য রেখে নীতি আয়োগ ত্রিপুরাকে ফ্রন্ট রানার স্টেট হিসেবে অভিহিত করেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে জিএসডিপি’র ক্ষেত্রে ত্রিপুরা দ্বিতীয় স্থানে এবং মাথাপিছু গড় আয়ের ক্ষেত্রেও রাজ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। শুধু তাই নয় গত ২০ বছরের মধ্যে রাজ্যে অপরাধের হার ৮.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে যা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। নারী স্বশক্তিকরণের লক্ষ্যে গ্রামীণ এলাকার মহিলাদের স্বসহায়ক দলে যুক্ত করে তাদের লাখপতি দিদি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টা জারি রয়েছে। এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী তার ভাষণে মহিলাদের কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের সচিব অভিষেক সিং। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের মন্ত্রী টিংকু রায়, বিধায়ক মীনারাণী সরকার, মুখ্যসচিব জে কে সিনহা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণের ইন্ডোর হলে রাজ্যের ৮টি জেলা থেকে বিভিন্ন স্বসহায়ক দলের প্রদর্শনী স্টল খোলা হয়। উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণাণ সহ অনুষ্ঠানের অন্যান্য অতিথিগণ প্রদর্শনী স্টলগুলি ঘুরে দেখেন এবং স্বসহায়ক দলের সদস্য-সদস্যাদের সঙ্গে এবং লাখপতি দিদিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

Leave a Reply