কলকাতা, ১৭ ফেব্রুয়ারি (আইএএনএস) : তিন কোটিরও বেশি টাকার সাইবার প্রতারণা মামলায় আরও একটি সিম বক্স চক্রের পর্দাফাঁস করল কলকাতা পুলিশ। এই ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
ধৃতের নাম মহম্মদ আমজাদ (৩৮)। সোমবার মধ্য কলকাতার অ্যামহার্স্ট স্ট্রিট এলাকায় হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ভয় দেখিয়ে বেহালার এক ব্যবসায়ী দম্পতির কাছ থেকে মোট ৩ কোটি ১ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি বিধাননগর পুলিশ একটি আলাদা সিম বক্স চক্রের অভিযোগে আবির শেখ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই আমজাদের নাম সামনে আসে।
ঘটনাটি ঘটে গত বছরের অক্টোবর মাসে। অভিযোগ, বেহালার ব্যবসায়ী বিধান ঘোষদস্তিদারকে এক ব্যক্তি কুরিয়ার সংস্থার আধিকারিক পরিচয়ে ফোন করে জানায়, তার নামে একটি পার্সেলে নিষিদ্ধ মাদক পাওয়া গেছে। এরপর বলা হয় যে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) ও ইডি তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে।
পরবর্তীতে ‘সিবিআই অফিসার অমিত কুমার’ পরিচয়ে আরেক ব্যক্তি ভিডিও কল করে ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়। দম্পতিকে মোবাইলের ভিডিও চালু রাখতে বলা হয়, যাতে তাদের গতিবিধি ‘সিবিআই নজরদারিতে’ রাখা যায়। ভিডিও কলে সিবিআই, ইডি ও আরবিআই-এর ভুয়ো পরিচয়পত্র ও নথিও দেখানো হয়। পরে আরও দু’জন যোগ দিয়ে নিজেদের আইপিএস অফিসার বলে পরিচয় দেয়। অভিযোগ, টাকা দিলে সব অভিযোগ থেকে রেহাই মিলবে, না হলে গ্রেফতার করা হবে—এমনই হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে দম্পতি মোট ৩ কোটি ১ লক্ষ টাকা প্রতারকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন।
প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে দম্পতি সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নেমে আমজাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার মার্কুইস স্ট্রিটে একটি দোকানও রয়েছে।
গ্রেফতারের আগে তার বাড়ি ও দোকানে তল্লাশি চালিয়ে ১২টি সিম বক্স, একটি ল্যাপটপ, ৯টি রাউটার, ওয়াই-ফাই যুক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, ১৭টি মোবাইল ফোন, ২,২৫০টি সিম কার্ড, ল্যান ও কেবলসহ একাধিক সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, সাধারণ মোবাইল ফোন থেকে নয়, বিশেষ ‘সিম বক্স’ যন্ত্র ব্যবহার করে এই কলগুলি করা হত। একসঙ্গে বহু সিম কার্ড বসিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কলকে স্থানীয় কল হিসেবে দেখানো যায় এই যন্ত্রে। ফলে আসল কলের উৎস গোপন রাখা সম্ভব হয় এবং সরকারি নিয়ম এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ কল রুট করা যায়।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, আবির শেখ বাগুইআটি, রাজাবাজার ও এসপ্ল্যানেড এলাকায় সিম বক্স নেটওয়ার্ক চালাত। নিজের অবস্থান গোপন রাখতে ভার্চুয়াল নম্বর ও বাংলাদেশে ভিপিএন ব্যবহার করত সে। তদন্তে তার মালয়েশিয়া যোগের কথাও উঠে এসেছে এবং সিম কার্ড সরবরাহকারী কয়েকজন সহযোগীর সন্ধান মিলেছে।
টেলিকম দফতরের তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি চালিয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে বাগুইআটির হাতিয়ারা এলাকা থেকে একটি সিম বক্স-সহ আবির শেখকে গ্রেফতার করে বিধাননগর কমিশনারেট। তার বয়ানের ভিত্তিতেই অ্যামহার্স্ট স্ট্রিট ও পার্ক স্ট্রিট থানার এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়।
প্রাথমিক জেরায় জানা গেছে, আবির একজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং অবৈধ কল রাউটিং চক্রে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রের মূল পান্ডা ত্রিপুরার বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন। তার সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক চুং ওয়েই কিয়াতের নামও জড়িয়েছে, যিনি মেডিক্যাল ভিসায় ভারতে এসেছিলেন।
এই চক্রের আন্তর্জাতিক যোগ কতটা বিস্তৃত এবং আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
2026-02-17

