গণভোটে সংস্কার প্যাকেজের অনুমোদনের পথে, ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিলের আশঙ্কা

নয়াদিল্লি, ১৩ ফেব্রুয়ারি (আইএএনএস) : বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা-র অপসারণের পর প্রথমবারের মতো ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে “জুলাই ন্যাশনাল চার্টার” (সংবিধান সংশোধনী) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর অধীনে একটি সাংবিধানিক সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণনা হওয়া ভোটের ৭৩ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে। তবে গণভোটের ফলাফল সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রস্তাবিত গণভোট অনুমোদিত হলে ‘উচ্চকক্ষ’ নামে দ্বিতীয় একটি কক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে সাধারণ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০টি আসন বণ্টন করা হবে। ফলে সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন এবং উচ্চকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে।

এছাড়া রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বাধ্যতামূলক করা হবে। নিম্নকক্ষে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বড় আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

সংস্কার প্যাকেজে পূর্বে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রস্তাবও রয়েছে। এই সরকার গঠন শাসক দল, প্রধান বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এই সংস্কারকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করলেও অনেক বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো সংবিধানের মৌলিক নীতিকে উল্টে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে কার্যত সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা প্রায় ৫৫ বছরের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অবসান ঘটাতে পারে। সংবিধানে গণভোটের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই বলেও তারা উল্লেখ করেন, যদিও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া হয়ে থাকে।

সংস্কার কার্যকর হলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু হবে। তবে সংবিধানে এ ধরনের কাঠামোর অনুমতি নেই বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ দাবি করছেন। ফলে বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৭, ১৯৮৫ এবং ১৯৯১ সালে। ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোট সামরিক শাসনামলে অনুষ্ঠিত হয়, আর ১৯৯১ সালের গণভোটে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের অনুমোদন চাওয়া হয়। অতীতের তিনটি গণভোটেই ৮৪.৩৮ থেকে ৯৮.৮৮ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত সংস্কারের কিছু ধারা ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। যদি এই সংস্কার কার্যকর হয়, তবে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে মুহাম্মদ ইউনূস সংস্কার বাস্তবায়নে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও ইতিবাচক পথে এগোবে এবং এটি বর্বরতা থেকে সভ্য সমাজের পথে অগ্রযাত্রার প্রতীক।

Leave a Reply