তড়িঘড়ি মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে লাভের চেয়ে ছাড়ই বেশি দিল ঢাকা: বাংলাদেশি গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ

নয়াদিল্লি, ১১ ফেব্রুয়ারি (আইএএনএস) : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য ঘোষিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশ শুল্কে আংশিক ছাড় পেলেও এর বিনিময়ে বড় ধরনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানো হলেও তা সামান্য স্বস্তি, যার বিনিময়ে বিলিয়ন ডলারের পণ্য ক্রয় এবং অন্যান্য শর্তে সম্মত হতে হয়েছে ঢাকাকে।

৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ শুধু শুল্ক হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি কাঠামো তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তির কিছু ধারা ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের বর্তমান সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামরিক সহযোগিতায় চীনের উপস্থিতি বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে এবং একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে প্রতিরক্ষা ক্রয় সীমিত রাখতে হবে। বিশ্লেষণে এই নির্দিষ্ট দেশ শব্দবন্ধকে চীনা সরবরাহকারীদের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

চুক্তির ৪.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি কোনও “নন-মার্কেট কান্ট্রি”-র সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক পরিভাষায় চীন ও রাশিয়াকে বোঝায়, তাহলে ওয়াশিংটন পুরো চুক্তি বাতিল করে শাস্তিমূলক শুল্ক পুনর্বহাল করতে পারবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ ও জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তি বাণিজ্যের পূর্ণ অস্ত্রীকরণ-এর মাধ্যমে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচন যখন বৃহস্পতিবার নির্ধারিত, তখন মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কেন এমন একটি চুক্তি তড়িঘড়ি সই করল, যা কার্যকর করার দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর পড়বে।

বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী একাধিক মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক দিতে হবে এবং কিছু পণ্যে পাঁচ ও দশ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমাতে হবে, যার সূচনা হবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৫০ শতাংশ হ্রাসের মাধ্যমে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মন্তব্য করেছেন, চুক্তিটি অত্যন্ত অসম, যেখানে বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘ তালিকার বাধ্যবাধকতা চাপানো হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা সীমিত। তাঁর মতে, সামান্য শুল্কছাড়ের বিনিময়ে এত বড় মূল্য দেওয়া যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং বিমান কিনবে, যা দেশের বিমান পরিবহণ খাতকে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের দিক থেকে সরিয়ে আনবে। কৃষিখাতে বাংলাদেশ অন্তত ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা আমদানি করবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের কথাও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, এই নির্দিষ্ট ক্রয় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যত মার্কিন কৃষিপণ্যের প্রবেশ প্রক্রিয়া সহজ করছে এবং পূর্বের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করছে।

Leave a Reply