ভারত–মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা, পীযূষ গোয়ালের পদত্যাগ দাবি সংযুক্ত কিসান মোর্চার

নয়াদিল্লি : ভারত–মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার পরই কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানাল সংযুক্ত কিসান মোর্চা (এসকেএম)। শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসকেএম নেতারা বলেন, এই চুক্তি মার্কিন কৃষি খাতের বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের শামিল।

এসকেএম নেতাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোর মধ্যে ড্রাইড ডিস্টিলার্স গ্রেইনস (ডিডিজি), পশুখাদ্যের জন্য লাল সরগম, ট্রি নাটস, তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ও মদ্যপ পানীয়সহ একাধিক পণ্যের অন্তর্ভুক্তি মার্কিন সংস্থাগুলিকে ভারতের পশুখাদ্য বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দেবে। আপেল ও তুলা চাষিদের নেতারা বলেন, তুলা আমদানিতে কোনও শিথিলতা জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো রাজ্যগুলির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।

সংযুক্ত কিসান মোর্চার নেতৃত্ব দাবি করেন, বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য যে কৃষি ও দুগ্ধ খাত নাকি চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁদের মতে, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে ইতিমধ্যেই দুগ্ধজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসকেএম নেতারা অভিযোগ করেন, পীযূষ গোয়াল সচেতনভাবেই ভুল তথ্য প্রচার করে কৃষক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। এই কারণেই তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারত–মার্কিন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, তা না হলে দেশজুড়ে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন শুরু হবে।

এসকেএম নেতারা আরও দাবি করেন, ২০২৩–২৪ সালে ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক যেখানে শূন্য থেকে বেড়ে ৩ শতাংশ হয়ে বর্তমানে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে, সেখানে মার্কিন কৃষিপণ্যের উপর ভারতের শুল্কহার ৩০ থেকে ১৫০ শতাংশ থেকে নামিয়ে শূন্য করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এর ফলে ভারতীয় কৃষি মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার করুণায় ঝুলে পড়বে।

পশুপালন খাত নাকি আমদানিকৃত পশুখাদ্যের দাবি জানিয়েছে, মন্ত্রীদের এই বক্তব্যকেও প্রশ্ন করেন এসকেএম নেতারা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, কোনও কৃষক কখনও আমদানিকৃত গবাদি পশুখাদ্যের দাবি তোলেননি। এসকেএম নেতা রাকেশ টিকাইত বলেন, কিছু পোলট্রি গোষ্ঠী ভুট্টা ও সয়াবিনভিত্তিক পশুখাদ্য আমদানির দাবি করছে, যাতে দেশে এই ফসলগুলির ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কমানো যায়। আমরা শুনেছি, আমেরিকার পশুখাদ্যে নন-ভেজিটেরিয়ান উপাদানও থাকতে পারে। সরকার কেন আমাদের গরুকে নিরামিষ-বিরোধী খাবার খাওয়াতে চায়?

এসকেএমের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে, যেসব পশুকে মাংস খাওয়ানো হয়, তাদের দুধ আমদানি করা উচিত নয়। সেটিই ছিল একটি অশুল্ক বাধা। এখন ‘মাস্টার’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে আরএসএস নিজেদের দাবিই গিলে খেতে বাধ্য হয়েছে এবং পুরোপুরি নতিস্বীকার করেছে, মন্তব্য করেন নেতারা।

অল ইন্ডিয়া অ্যাপল ফার্মার্স ফেডারেশনের নেতা ও জম্মু ও কাশ্মীরের বিধায়ক এম ওয়াই তারিগামি বলেন, এই বাণিজ্য চুক্তি কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশের অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তাঁর কথায়, “বিপণন ব্যবস্থার অভাব ও জলবায়ুজনিত সমস্যার কারণে আপেল চাষিরা আগেই সংকটে রয়েছেন। এই ঘোষণা আপেল ও ট্রি নাট চাষিদের জন্য বড় ধাক্কা। জম্মু ও কাশ্মীরের মতো রাজ্যে শিল্পের বিকল্প নেই, আপেল ও শুকনো ফলের চাষই মানুষের একমাত্র জীবিকা। কেন্দ্র সরকার কৃষকদের কথা না ভেবে আমেরিকার প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করছে।”

তুলা আমদানি প্রসঙ্গে জানানো হয়, ভারত প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়া থেকে তিন লক্ষ বেল শুল্কমুক্ত তুলা পায়, আফ্রিকা থেকে ৫.৫ শতাংশ শুল্কে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩২ মিমির বেশি দৈর্ঘ্যের তুলা শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা হয়। বর্তমানে কটন কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (সিসিআই) বিক্রিত ভারতীয় তুলার দাম ব্রাজিলীয় তুলার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। চলতি তুলা বিপণন মরশুমে (অক্টোবর ২০২৫–সেপ্টেম্বর ২০২৬) ইতিমধ্যেই বাজারে এসেছে ২২৫ লক্ষ বেল তুলা, এবং আরও প্রায় ১০০ লক্ষ বেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কটন অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার সভাপতি অতুল গণাত্রা জানান, ভারতীয় তুলা যতদিন দামে বেশি থাকবে, ততদিন আমদানি চলতেই থাকবে, তবে ভারত–মার্কিন চুক্তির আওতায় তুলা আমদানির নির্দিষ্ট শর্ত এখনও স্পষ্ট নয়।

মহারাষ্ট্রের তুলা চাষিদের নেতা অজিত নাওয়ালে বলেন, ভারতের তুলা উৎপাদন অনেক বিদেশি দেশের তুলনায় কম। এই পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্তভাবে মার্কিন তুলা আমদানি করা হলে দেশের তুলা চাষিদের অবস্থা আরও সংকটজনক হয়ে উঠবে। এসকেএম নেতারা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য কৃষকদের আহ্বান জানান এবং শ্রমিকদের সাধারণ ধর্মঘটকে সমর্থন করার ডাক দেন, যা তাঁদের মতে জনবিরোধী মোদি সরকারের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব হবে।

Leave a Reply