বেজিং, ৮ ফেব্রুয়ারি : তিব্বতি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় জীবনে আরও কড়াকড়ি আরোপ করল চিন সরকার। ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের মঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তিব্বতি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও গবেষকরা।
তিব্বত ও প্রবাসী তিব্বতিদের নিয়ে কাজ করা সংবাদমাধ্যম ফায়ুল জানিয়েছে, চীনের মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাটে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, খাম অঞ্চলের একটি মঠের প্রবেশপথে নোটিস টাঙানো রয়েছে, যেখানে স্পষ্ট লেখা ১৮ বছরের নীচে শিশুদের মঠে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে শীতকালীন ছুটির সময়ে, যখন তিব্বতি অঞ্চলে স্কুলগুলি বার্ষিক ছুটির জন্য বন্ধ থাকে। এই সময়ে সাধারণত তিব্বতি শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে মঠে যেত। তবে নতুন নির্দেশিকার ফলে পরিবারের সঙ্গে থাকলেও শিশুদের মঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তিব্বত ওয়াচ-এর গবেষক সোনাম তবগিয়াল জানান, এই সিদ্ধান্ত তিব্বতি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ভেঙে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ। ফায়ুল-কে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তিব্বতে চালু হওয়া একাধিক চিনা নীতি, যেমন তিব্বতি শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক আবাসিক প্রাক্-প্রাথমিক স্কুল, ছুটির সময় মঠে তিব্বতি ভাষা শিক্ষা নিষিদ্ধ করা এবং শীতকালীন ছুটিতে শিশুদের মঠে যাওয়া বন্ধ করা, সব মিলিয়ে শিশুদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গঠনমূলক সময়ে সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে। তবগিয়ালের মতে, এই পদক্ষেপগুলি আসলে একটি “ঔপনিবেশিক প্রকল্প”, যার লক্ষ্য তিব্বতি শিশুদের দৈনন্দিন জীবন থেকে তিব্বতি সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিব্বতি শিশুদের জন্য পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত স্কুলগুলিতে অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে, যা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের নজরদারিতে চলে। এই দপ্তর মূলত জাতিগত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিব্বতি শিক্ষার্থীদের ওপর আদর্শগত প্রভাব বিস্তার করা হয় এবং জোরপূর্বক ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সমন্বয় চাপিয়ে দেওয়া হয়।
সমালোচকদের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিব্বতি শিশুদের মাতৃভাষা ও নিজস্ব পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে চিনা ভাষা, চিনা পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যে অভ্যস্ত করে তোলা হচ্ছে। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, শীত ও গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পর শিশুরা নিজেদের মধ্যে চিনা ভাষায় কথা বলে, প্রশ্নের উত্তরও চিনা ভাষাতেই দেয় এবং মঠে যেতে ভয় বা দ্বিধা প্রকাশ করে। এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক মহলে তিব্বতি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

