আগরতলা, ৮ ফেব্রুয়ারী : কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও কৃষি-বাণিজ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাধিক দাবিকে সামনে রেখে বাঙালি কৃষক সমাজ ও শ্রমজীবী সমাজের পক্ষ থেকে রাজ্যভিত্তিক সম্মেলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হল।
সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, এফডিআই নীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার অবাধে বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলিকে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দিচ্ছে। এর ফলে দেশীয় ছোট, খাটো ও মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বত্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদেশি কোম্পানি ও দেশীয় কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যতটা সক্রিয়, ততটাই উদাসীন সাধারণ ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি বলে অভিযোগ তোলা হয়।
বক্তারা বলেন, অনলাইন ব্যবসা ও শপিং মল ফুলে-ফেঁপে উঠলেও সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভারত কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বর্তমানে কৃষির উপর নির্ভর করে জীবনধারণ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। ক্ষতির মুখে পড়ে বহু কৃষক কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলেই রাজ্য ও বহির্রাজ্যে কৃষিজমি ভরাট করে উচ্চ দামে বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। এতে একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে। এই গুরুতর পরিস্থিতিতেও সরকারের কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ।
সম্মেলনে আরও বলা হয়, দেশে কৃষিকে এখনও শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা হলেও কর্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক আত্মহত্যার পথে হাঁটছেন, আবার অনেকে জীবিকার তাগিদে ভিনরাজ্যে বা ভিনদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। অথচ কর্পোরেট ও বহুজাতিক সংস্থাগুলি কৃষিজাত পণ্য ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা করছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, সার, বীজ, ওষুধ ও কৃষিযন্ত্রের মতো কৃষি সহায়ক পণ্যের দাম অত্যধিক। প্রতিটি ব্লকে পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থা ও হিমঘরের অভাব রয়েছে। ফলে মরশুমে ফসল উৎপাদন হলেও ন্যায্য দাম পান না কৃষকরা। আর্থিক দুর্বলতার কারণে ফসল সংরক্ষণ করতে না পারায় কৃষিজাত পণ্য স্বল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তাঁরা। এই সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক সংস্থাগুলি সেই পণ্য প্রক্রিয়াকরণ করে উচ্চ দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে বাঙালি কর্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কৃষিজাত পণ্যকে কাজে লাগিয়ে কর্ষক সমবায় গড়ে তোলা হলে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং ভবিষ্যতে কৃষির প্রতি আগ্রহ বাড়বে বলে মত প্রকাশ করা হয়। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য রফতানির পথও খুলবে বলে দাবি করা হয়।
সম্মেলন থেকে রাজ্য ও দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সেগুলি হল, কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে প্রতিটি কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ, প্রতিটি ব্লকে হিমঘর স্থাপন, অনাবাদি জমিকে চাষযোগ্য করতে সর্বত্র সেচব্যবস্থা চালু, সার, বীজ, ওষুধ ও কৃষিযন্ত্রের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ব্লকে ব্লকে কৃষিজাত কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্প স্থাপন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান, সব ধরনের কৃষিঋণ মুকুব ও সর্বজনীন কৃষি বিমা চালু, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, রেগা মজুরি বৃদ্ধি, কৃষিজাত ও কৃষি সহায়ক পণ্যকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং ৬০ বছর বয়সে কৃষক ও শ্রমজীবীদের জন্য পেনশন স্কিম চালু।
বক্তারা স্পষ্ট জানান, দাবি মানা না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র করা হবে।

