ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫–২৬: ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশ

নয়াদিল্লি : ভোগ ও বিনিয়োগ—এই দ্বৈত চালিকাশক্তির উপর ভর করে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে টানা চতুর্থ বছরের মতো ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। সংসদে আজ কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন কর্তৃক উপস্থাপিত ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫–২৬-এ এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৮ থেকে ৭.২ শতাংশের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার প্রায় ৭ শতাংশ হিসেবে অনুমান করা হয়েছে।

ইকোনমিক সার্ভেতে উল্লেখ করা হয়েছে যে আর্থিক বছর ২৬-এ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রধান ভরকেন্দ্র হিসেবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রথম অগ্রিম হিসাব অনুযায়ী, জিডিপিতে চূড়ান্ত ব্যক্তিগত ভোগব্যয়-এর অংশ বেড়ে ৬১.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কম মুদ্রাস্ফীতি, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ভোগব্যয়ের এই শক্তিশালী ধারা বজায় রয়েছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে শক্তিশালী কৃষি পারফরম্যান্সের জেরে ভোগব্যয় স্থিতিশীল রয়েছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের যুক্তিসংগত সংস্কারের ফলে শহুরে ভোগব্যয়েও ধীরে ধীরে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি যে সর্বস্তরে বিস্তৃত, তা স্পষ্ট হয়েছে।

ভোগব্যয়ের পাশাপাশি আর্থিক বছর ২৬-এ বিনিয়োগও প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। স্থূল স্থায়ী মূলধন গঠন জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থবর্ষের প্রথমার্ধে জিএফসিএফ বৃদ্ধি পেয়েছে ৭.৬ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি এবং প্রাক্‌-মহামারি গড় হার ৭.১ শতাংশেরও ঊর্ধ্বে।

সার্ভে অনুযায়ী, আর্থিক বছর ২৬-এ কৃষি ও সহযোগী খাতের বৃদ্ধি প্রায় ৩.১ শতাংশ হবে বলে অনুমান। অনুকূল বর্ষার কারণে অর্থবর্ষের প্রথমার্ধে কৃষি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই সময়ে কৃষি জিভিএ বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, যা আর্থিক বছর ২৫-এর প্রথমার্ধের ২.৭ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় বেশি, যদিও দীর্ঘমেয়াদি গড় ৪.৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। পশুপালন ও মৎস্যচাষের মতো সহযোগী খাতগুলি ৫–৬ শতাংশ হারে স্থিতিশীল বৃদ্ধি বজায় রেখেছে।

ইকোনমিক সার্ভে জানিয়েছে, শিল্প খাত ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আর্থিক বছর ২৬-এর প্রথমার্ধে উৎপাদন খাতের বৃদ্ধি হয়েছে ৮.৪ শতাংশ, যা বার্ষিক অনুমানিত ৭.০ শতাংশের চেয়েও বেশি। অবকাঠামো প্রকল্পে ধারাবাহিক সরকারি মূলধনী ব্যয়ের ফলে নির্মাণ খাতও স্থিতিশীল রয়েছে।

আর্থিক বছর ২৬-এ শিল্প খাতের সামগ্রিক বৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা আর্থিক বছর ২৫-এর ৫.৯ শতাংশের তুলনায় বেশি। পিএমআই, আইআইপি এবং ই-ওয়ে বিল জেনারেশনের মতো উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি সূচকগুলি উৎপাদন খাতে চাহিদানির্ভর শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরবরাহপক্ষের দিক থেকে পরিষেবা খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক হিসেবে রয়ে গেছে। আর্থিক বছর ২৬-এর প্রথমার্ধে পরিষেবা খাতের জিভিএ বেড়েছে ৯.৩ শতাংশ এবং গোটা অর্থবর্ষে এটি প্রায় ৯.১ শতাংশ হবে বলে অনুমান। কোভিড-প্রভাবিত ‘বাণিজ্য, হোটেল, পরিবহণ ও যোগাযোগ’ উপখাত এখনও প্রাক্‌-মহামারি গড়ের থেকে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, সামগ্রিকভাবে পরিষেবা খাতে বিস্তৃত ভিত্তিতে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সার্ভেতে জানানো হয়েছে যে চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য শিথিলতা এসেছে। আর্থিক বছর ২৬-এর এপ্রিল–ডিসেম্বর সময়কালে শিরোনামভিত্তিক ভোক্তা মূল্য সূচক মুদ্রাস্ফীতি নেমে এসেছে ১.৭ শতাংশে। খাদ্যদ্রব্য, বিশেষত সবজি ও ডালের দামে পতন এর প্রধান কারণ।

সরকারের বিচক্ষণ রাজস্ব নীতির ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মূলধন গঠনের গতি বজায় রয়েছে। নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ কর আদায় বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে। জিএসটি সংগ্রহও একাধিকবার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূলধনী ব্যয় শক্তিশালী বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নত করেছে।

সরকারের রাজস্ব শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতিকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের সার্বভৌম বন্ড ইয়িল্ড কমেছে। ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসএন্ডপি রেটিং ভারতের রেটিং ‘বিবিবি-’ থেকে ‘বিবিবি’-তে উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে কেয়ারএজ গ্লোবাল ভারতকে ‘বিবিবি+’ রেটিং প্রদান করেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যেও আর্থিক বছর ২৫-এ ভারতের মোট রপ্তানি পৌঁছেছে ৮২৫.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার-এ। আর্থিক বছর ২৬-এও এই গতি বজায় রয়েছে। পরিষেবা রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের জোরে চলতি হিসাবে ঘাটতি আর্থিক বছর ২৬-এর প্রথমার্ধে জিডিপির মাত্র ০.৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার ১১ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫–২৬ অনুযায়ী, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্যকর ব্যালান্স শিট, নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা মিলিয়ে ভারতের মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক বছর ২৭-এর জন্য ৬.৮–৭.২ শতাংশ* প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সতর্ক হলেও আশাব্যঞ্জক বলে সার্ভেতে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply