এক সপ্তাহে বাবা–মাকে হারিয়ে অনাথ ৮ বছরের নয়ন, মানবিকতার প্রশ্নে বিদ্ধ সুশীল সমাজ

আগরতলা, ২০ জানুয়ারি : এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাবা ও মাকে হারিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছে আট বছরের শিশু নয়ন চন্দ্র নমঃ। বক্সনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সোনামুড়া মহকুমার কুলুবাড়ি গ্রামের নুতন কলোনিতে অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী এক ভিক্ষুক দম্পতির একমাত্র সন্তান নয়নের শেষমেশ ঠাঁই হয়েছে চাইল্ড হোমে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের ছবি উঠে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজন মানবদরদি মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন এত বড় বিপদের সময়ে কেন কোনো নেতা-মন্ত্রীর সহানুভূতি বা সাহায্য মিলল না শিশুটির জন্য?

চরম সামাজিক নিষ্ঠুরতা ও মানবিক অবহেলার এক ভয়াবহ নজির তৈরি হয়েছে এই ঘটনায়। অর্থাভাবে মৃত্যুর ১৭ দিন পর সৎকার হয় নয়নের মা চম্পা দেবনাথের মৃতদেহের। স্ত্রীর মৃত্যুর শোক ও দুশ্চিন্তা সহ্য করতে না পেরে পাঁচ দিনের মাথায় মৃত্যু হয় তার বাবা রাধাচরণ নমঃ-এর। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে যায় নয়ন।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি জানুয়ারি মাসের শুরুতে। প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে আগুন পোহাতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত শরীরে আগুন লেগে যায় চম্পা দেবনাথের। এলাকার কয়েকজন সহৃদয় মানুষের সহায়তায় তাঁকে প্রথমে সোনামুড়া হাসপাতাল, পরে আগরতলার জিবি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে কিছু সময় পর কার্যত চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল পরিবারটির পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয়নি। প্রথম দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, তারাও নিজেদের আর্থিক অক্ষমতার কারণে পরে পিছিয়ে যান।

অসহায় রাধাচরণ স্ত্রীকে হাসপাতালের বেডে রেখেই সোনামুড়ায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। চিকিৎসার অভাবে জিবি হাসপাতালেই মৃত্যু হয় চম্পার। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় কুলুবাড়ির নুতন কলোনিতে অস্থায়ী বাসস্থানেই মৃত্যু হয় রাধাচরণের। স্থানীয় শ্রীজীব নমঃ সহ কয়েকজনের উদ্যোগে তাঁর দেহের সৎকার সম্পন্ন হয়।

অন্যদিকে, নয়নের মা চম্পা দেবনাথের মৃতদেহ প্রায় পক্ষকাল ধরে জিবি হাসপাতালের মর্গে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে ছিল। সোমবার শ্রীজীব নমঃ ও ‘আকাঙ্ক্ষা’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় হাসপাতাল থেকে দেহ উদ্ধার করে বটতলার মহাশ্মশানে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে মাত্র আট বছর বয়সী নয়ন নিজেই।

স্থানীয়দের মতে, রাধাচরণের আদি বাড়ি ছিল বক্সনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মানিক্যনগরে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করতেন এবং জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন এলাকায় ঠিকানা বদলাতে হতো। প্রায় তিন-চার মাস আগে তারা কুলুবাড়ির নুতন কলোনির একটি পরিত্যক্ত ঘরের বারান্দায় আশ্রয় নেয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর পরপর মৃত্যু ও একটি শিশুর অনাথ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পঞ্চায়েতকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—যে সময়ে নয়ন মা-বাবার মৃত্যুতে সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা, ঠিক সেই সময়েই তার অস্থায়ী বাসস্থানের অদূরে চলছিল নাইট ক্রিকেটের জমকালো আয়োজন। বিপুল অর্থ ব্যয়ে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিধায়কসহ দুই মন্ত্রী। অথচ এই মর্মান্তিক ঘটনার খোঁজ নেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—উৎসব ও আড়ম্বর থাকলেও, সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায় কি কারও নেই?

Leave a Reply