ইরানে সহিংস বিক্ষোভের পর ভারতে ফেরত ভারতীয় নাগরিকরা সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে; ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা

নয়াদিল্লি, ১৭ জানুয়ারি: শুক্রবার রাতে ইরান থেকে ভারতে প্রথম দুটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট এসে পৌঁছেছে, যখন দেশটির খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। এসব ফ্লাইট ছিল সাধারণ বাণিজ্যিক, কোনো বিশেষ উদ্ধরণ অভিযানের অংশ নয়। তবে ভারত সরকার কোনো অবস্থাতেই প্রস্তুত রয়েছে এবং আগেই ইরানে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে নাগরিকদের সতর্ক করেছে।

১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ইরানি আকাশপথ সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের কিছু ফ্লাইটে দেরি হয়, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং বহু ভারতীয় নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন, যখন ইরানের আকাশপথে বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে।

ভারতে ফেরত আসা নাগরিকরা সরকারের সহায়তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তেহরানে ভারতীয় দূতাবাস সরকারের পক্ষ থেকে পর্যটক, ছাত্র, ব্যবসায়ী এবং তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োজিত ছিল।

একজন এমবিবিএস শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, “আমি বিক্ষোভের খবর শুনেছিলাম, তবে আমি নিজে কখনো কোনো সহিংসতা দেখিনি এবং ইন্টারনেট পরিষেবা ছিল না।” অন্য একজন, যিনি এক মাস ধরে ইরানে ছিলেন, বলেছেন, “শেষ কিছু সপ্তাহে বাইরে বের হলে বিক্ষোভকারীরা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত। তারা কিছুটা সমস্যা তৈরি করত, আর ইন্টারনেট না থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এটা আমাদের জন্য চিন্তার বিষয় ছিল।”

একজন বৈদ্যুতিন প্রকৌশলী যিনি কাজের জন্য ইরানে গিয়েছিলেন, জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, তার জন্য শুধুমাত্র নেটওয়ার্ক সমস্যা ছিল। “তেহরানে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। যদিও বিক্ষোভ ছিল এবং কিছুটা সহিংসতাও ঘটেছিল, তবে সরকারের সমর্থনে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।”

ইরানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দেশটির গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত হয়েছিল। রিয়াল মুদ্রার মান প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২ শতাংশে পৌঁছায়। এই অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সরকার জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ৩,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরান ইস্যুতে হুমকি দিয়েছেন এবং পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। তবে তিনি এখন বলেছেন, “ইরানে হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ কমে এসেছে, তবে যদি আরও রক্তপাত হয়, তাহলে সেখানে গুরুতর পরিণতি হতে পারে।”

এই পরিস্থিতিতে, ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইরান সরকারের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকির পর, সারা বিশ্বে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে, বর্তমানে ট্রাম্প কিছুটা তার আগ্রাসী মনোভাব থেকে সরে এসেছেন এবং ইরানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে।

ইরান এবং ইসরায়েল বিষয়ে চলমান আলোচনা এবং ইউএসের সামরিক প্রস্তুতি কৌশলগতভাবে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। এমনকি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে শান্ত করার জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

হিউম্যান রাইটস অ্যাকশন নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, ১৯,০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে তাসনিম নিউজ এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩,০০০। বিক্ষোভকারীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল এবং কিছু এলাকায় সহিংসতা চলছিল।

এদিকে, ইরান সরকার অভিযোগ করেছে যে বিদেশি শক্তি তাদের দেশের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং, বর্তমানে ইরানে পরিস্থিতি যতই স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, তবুও সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ গভীর নজরদারির আওতায় রয়েছে।