আগরতলা, ১০ জানুয়ারি: আগামী ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ঐতিহ্যবাহী ভৈরব মেলাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির বিরোধে ফটিকরায়ে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আইনের শাসনকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে ঊনকোটি জেলার ফটিকরায় থানাধীন সায়দারপাড়–শিমুলতলা এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ওই এলাকায় একের পর এক বাড়িঘর, দোকানপাট ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাঙচুর এবং মারপিটে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১০ জন গ্রেফতারও করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফটিকরায় থানার অধীন কাঞ্চনবাড়ি মেইন রোডের সায়দারপার ভৈরব থলিতে ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি ভৈরব মেলার চাঁদা তোলা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। চাঁদা চাইতে গিয়ে কাঠবোঝাই গাড়ির মালিক মসব্বির আলীর সঙ্গে মেলা কমিটির বচসা থেকে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এরপরই শুরু হয় বাকবিতণ্ডা, যা দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।পরে কিছু মানুষ রাস্তা অবরোধ করে এবং কয়েকটি দোকানে আগুন লাগায়। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ, মারপিট ও অগ্নিসংযোগে গোটা এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানিয়েছেন, একটি পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে একদল উন্মত্ত দুষ্কৃতী এলাকায় তাণ্ডব চালায়। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় একটি কাঠের দোকানসহ একাধিক বাড়ির সামনে রাখা খড়ের মোড়ল। ভাঙচুর করা হয় বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি ও যানবাহন। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন কয়েকজন নিরীহ মানুষ। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক চরমে পৌঁছায়।
এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। টিএসআর, সিআরপিএফ ও আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে। উত্তেজিত ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে বাধ্য হয়ে মৃদু লাঠিচার্জ করতে হয়। পাশাপাশি ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে চলছে কড়া নজরদারি। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক ডঃ তমাল মজুমদার এবং ঊনকোটি জেলার ভারপ্রাপ্ত জেলা পুলিশ সুপার অবিনাশ রাই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি ঠেকাতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার জন্য ঊনকোটি জেলায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত জেলা পুলিশ সুপার অবিনাশ রাই জানান,
কিছু দুষ্কৃতী পরিকল্পিতভাবে এলাকায় ঢুকে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এলাকায় এখনও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। শান্তি বজায় রাখতে বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল। একই সঙ্গে ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের গুজব বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হলে কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন।
পূজোর চাঁদার নামে প্রকাশ্য সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের এই ঘটনা আবারও বড় প্রশ্ন তুলে দিল— সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কি এতটাই মূল্যহীন? ফটিকরায়ের এই লজ্জাজনক ঘটনা প্রমাণ করে দিল, দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ ছাড়া শান্তি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা কঠিন।
এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে মন্ত্রী সুধাংশু দাস বলেন, ফটিকরার সায়দারপার এলাকায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় বিধায়ক।স্থানীয় নেতৃত্ব ও পুলিশ প্রশাসন যথাযথ তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত করেছেন।
মন্ত্রী আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই যে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে, বলেন তিনি। তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন, এই মুহূর্তে মিথ্যা, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রশাসনের নির্দেশনার প্রতি সবাইকে শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

