নিউ ইয়র্ক, ৬ জানুয়ারি : মার্কিন আদালতে নিজেকে ‘যুদ্ধবন্দি’ (প্রিজনার অব ওয়ার) বলে ঘোষণা করে চমক দিলেন ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। নিউ ইয়র্কের এক আদালতে হাজির হয়ে তিনি দাবি করেন, কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর হাতে তাঁর আটক হওয়া কোনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান নয়, বরং একটি সামরিক অভিযান। সেই যুক্তিতেই তিনি মার্কিন মাদক-সন্ত্রাস ও কোকেন পাচারের অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।
সপ্তাহান্তে নাটকীয় অভিযানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স কারাকাসের একটি কম্পাউন্ড থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিউ ইয়র্ক আদালতে হাজির করা হয় তাঁকে। সেখানে মাদুরো বলেন, তাঁকে “অপহরণ” করা হয়েছে এবং তিনি কোনও সাধারণ আসামি নন।
নিজেকে যুদ্ধবন্দি আখ্যা দিয়ে মাদুরো আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর দাবি, যদি তাঁকে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধবন্দি হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে তাঁর উপর জেনেভা কনভেনশন প্রযোজ্য হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁকে বেসামরিক আদালতে বিচার করা যায় না বা সাধারণ অপরাধীর মতো সাজা দেওয়া যায় না।
যুদ্ধবন্দিদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখার বিধান থাকে, ব্যক্তিগত অপরাধের ভিত্তিতে শাস্তির নয়। মাদুরোর এই দাবি কূটনৈতিক স্তরেও বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, যদিও আদালতে তা টেকার সম্ভাবনা কম।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই যুক্তি খারিজ করেছে। তাদের দাবি, এটি একটি আইন-প্রয়োগকারী অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল বহুদিন ধরে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে মার্কিন আদালতের সামনে হাজির করা। উদাহরণ হিসেবে তারা ১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে মাদক মামলায় আটক করার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। বিচারপতি অ্যালভিন কে হেলারস্টাইন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আপাতত মাদুরোর বিরুদ্ধে মামলা একটি সাধারণ ফেডারেল ফৌজদারি মামলাই হিসেবে চলবে।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ১৯৯৯ সালে সরকারি পদে প্রবেশের পর থেকেই মাদুরো ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল ভেনিজুয়েলাকে কোকেন পাচারের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মাদুরো, তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস, তাঁদের ছেলে নিকোলাস এরনেস্তো মাদুরো গেরা এবং শীর্ষ সহযোগীরা কলম্বিয়ার ফার্ক, মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জেতাস কার্টেল এবং ভেনিজুয়েলার ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাংয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন—যাদের সবাইকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রসিকিউটরদের দাবি, মাদক চালানের জন্য প্রশাসনিক সুরক্ষা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হতো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপব্যবহার করা হয়েছে এবং নিরাপদে কোকেন পাচারের বদলে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মাদুরো নিজের, শাসকগোষ্ঠী এবং পরিবারের স্বার্থে এই মাদক বাণিজ্যকে প্রশ্রয় দেন বলেও অভিযোগ।
মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, তিনি মাদক পাচার সংক্রান্ত ঘুষ হিসেবে লক্ষ লক্ষ ডলার গ্রহণ করেছেন। মাদুরো বরাবরই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। আদালতে তাঁর আইনজীবী বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে মাদুরোর আইনি দায়মুক্তি থাকা উচিত এবং তাঁকে জোর করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা অবৈধ।
আদালত কক্ষ থেকে বেরোনোর সময়ও মাদুরো বারবার বলেন, তাঁকে “অপহরণ” করা হয়েছে এবং তিনিই ভেনিজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্য মামলার গতিপথ বদলাবে না। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে কলাম্বিয়া ল’ স্কুলের অধ্যাপক ও প্রাক্তন ফেডারেল প্রসিকিউটর ড্যানিয়েল সি রিচম্যান বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন বা দায়মুক্তির প্রশ্ন তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত এটি একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবেই নিষ্পত্তি হবে।”
তিনি আরও বলেন, আদালতের কর্তৃত্ব মানতে মাদুরোর অস্বীকার মামলার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। এদিকে বিচারপতি হেলারস্টাইন মাদুরোর বক্তব্য থামিয়ে জানিয়ে দেন, এসব যুক্তি তোলার জন্য “উপযুক্ত সময় ও স্থান” আসবে। আপাতত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট—নিকোলাস মাদুরো একজন অভিযুক্ত, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা চলবে।

