টিটিপি সামরিক রূপ নিচ্ছে, বাড়ছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট

নয়াদিল্লি, ২৬ ডিসেম্বর: পাকিস্তানের জন্য নতুন করে বড়সড় সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নিজেদের সংগঠনকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক কাঠামোর রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবর। এর ফলে আগামী দিনে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর আধিকারিকদের মতে, ইতিমধ্যেই টিটিপি পাকিস্তান সেনার উপর বড় ক্ষতি করেছে এবং আগামী বছরে এই সংঘর্ষ দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হিমশিম খাচ্ছে পাকিস্তান, আর সামনের দিনে এই চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

টিটিপি তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আগে থেকেই প্রচারযন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে আগ্রাসী প্রচার চালানো হচ্ছে। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই বালুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) অঞ্চলে হামলার সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে।

২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর থেকে টিটিপি ব্যাপকভাবে পাকিস্তান সেনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। সংগঠনটি তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নতুন নতুন অঞ্চল যুক্ত করেছে, যার মধ্যে গিলগিট-বালতিস্তানও রয়েছে। সামরিক নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। দক্ষিণ সামরিক অঞ্চলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে এহসানুল্লাহ ইপিকে, যিনি ফকির ইপির প্রপৌত্র।

এছাড়াও কেন্দ্রীয় সামরিক অঞ্চলের প্রধান হিসেবে হিলাল গাজির নিয়োগ টিটিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রাজনৈতিক কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আজমতুল্লাহ মেহসুদকে, যদিও মাওলভি ফকির কমিশনের সদস্য হিসেবেই থাকছেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, টিটিপি নিজস্ব ‘এয়ার ফোর্স’ গঠনের পরিকল্পনাও করছে। বিষয়টি এখনও আলোচনাধীন, তবে ২০২৬ সালের শেষের দিকে তা কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা। চলতি মাসের শুরুতে আফগান সীমান্তের কাছে কেপি অঞ্চলে একটি রাস্তার পাশে পোঁতা বোমা বিস্ফোরণে তিন পাকিস্তানি পুলিশকর্মী নিহত হন। ওই ঘটনার জন্য দ্রুত টিটিপিকেই দায়ী করে ইসলামাবাদ।

আধিকারিকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য টিটিপি সমস্যা শিগগিরই মিটে যাওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। টিটিপি ইস্যুকে কেন্দ্র করে আফগান তালিবান ও পাকিস্তানের সম্পর্কও মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। পাকিস্তান কোনও প্রমাণ ছাড়াই আফগান তালিবানের বিরুদ্ধে টিটিপিকে মদত দেওয়া এবং তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

পাকিস্তান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আফগান তালিবানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—তাদের টিটিপি ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। তবে তালিবানের বক্তব্য, টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং ইসলামাবাদকেই তা সামলাতে হবে।

অন্যদিকে, পাকিস্তান টিটিপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স (আইএসকেপি) ও লস্কর-ই-তৈবার মধ্যে জোট গঠনের চেষ্টা করেছে। পাকিস্তানের আশা ছিল, এই জোট টিটিপিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু বাস্তবে টিটিপির গতি কমার কোনও ইঙ্গিত নেই।

আইএসকেপি এই জোটে সম্মত হলেও লস্কর-ই-তৈবার ভিতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। হাফিজ সইদের প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের অনেক সদস্যই মনে করেন, টিটিপি বা আফগান তালিবানের বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্যায় হবে। এই কারণেই জোটের কার্যকারিতা এখনও খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তান বিশেষজ্ঞদের মতে, টিটিপি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা পাকিস্তান সেনার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এই সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করা পাকিস্তানের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে এবং আগামী বছরে টিটিপি চলতি বছরের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।