আগরতলা, ২৩ ডিসেম্বর : চেনা মেজাজের বাইরে গিয়ে আজ মহিলা মোর্চার সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. মানিক সাহা জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছেন। শরিক দলের দ্বিচারিতায় অত্যন্ত রুষ্ট তিনি আজ রামচন্দ্রঘাটে দাঁড়িয়ে রাজ্যে উগ্রপন্থার নির্মম অতীতের স্মৃতিচারণ করেছেন। সাথে তিনি রাজনীতির কারবারিদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত যুব সমাজকে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আটকানোর জন্য সতর্ক করেছেন। বামেদের দিকে তিনি সরাসরি তোপ দাগলেও, তিপরা মথার নাম মুখে না এনেই তাঁদের প্রতি একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। প্রাক্তন এটিটিএফ সুপ্রিমো তথা বর্তমান তিপরা মথার বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মার গড়ে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এইভাবে হুঙ্কার যথেষ্ট তাত্পর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
আজ সমাবেশে ভাষণের শুরু থেকেই তিনি ঝাঝালো সুরে বলতে শুরু করেন। তিনি সুর চড়িয়ে বলেন, রাজ্যে বিজেপির জনসভায় জনজাতিদের ব্যবহার করে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বিদ্রুপ করে বলেন, দেশের একটি জাতীয় দলকে সভা করতে বাধা দেওয়া খুবই হাস্যকর। তাঁর সাফ কথা, রাজ্যে কখনও অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সেদিকে সরকার সজাগ ও সতর্ক। তবে শান্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে শক্তি প্রয়োগ করতেও পিছপা হবে না সরকার।
তাঁর অভিযোগ, বিজেপির কর্মী ও সমর্থকদের উপর নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। কিছুদিন আগেই মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মার উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তিনি ঊষ্মা প্রকাশ করে বলেন, শরিক দল প্রতিনিয়ত বিজেপিকে ব্ল্যাকমেল করছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার ইতিহাসে জনজাতি, মণিপুরী ও বাঙালি সকল জাতির মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসী দেখেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনও মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র একটি জাতির স্বার্থে কাজ করেছেন।
তাঁর দাবি, অতীতে জনজাতিদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি তাঁদের শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত রাখা হয়েছে। নাম না করে তিপরা মথাকে নিশানায় নিয়ে তাঁর কটাক্ষ, বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদী কায়দায় জনজাতিদের শিক্ষার অধিকার থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র ‘থানসা’ ও ‘গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড’ ইস্যুতে জনজাতিদের ব্যস্ত রেখে শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, জনজাতিদের বিভ্রান্ত করে রাজনীতির খেলা চলছে। তবে এভাবে বেশিদিন ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তিপরা মথার অধিকাংশ দাবিই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার পূরণ করার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি শাসক দলের জোটসঙ্গী হয়েও তাঁদের কোনও জোটধর্ম বজায় রাখার আচরণ চোখে পড়ে না। সাথে তিনি যোগ করেন, ত্রিপুরায় জাতি ও জনজাতিকে আলাদা করার রাজনীতি কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
এদিন সিপিআইএমকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, বাম আমলে উগ্রপন্থীদের হত্যালীলা রাজ্যবাসী আজও ভুলে যায়নি। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, খুনসহ একাধিক অপরাধমূলক ঘটনার সাক্ষী রয়েছে এই রাজ্য। নৃশংসতার বর্ণনায় মুখ্যমন্ত্রী তুলে ধরেন গন্ডাছড়ায় বিজেপির মণ্ডল সভাপতি চাঁদমোহন ত্রিপুরা, জনজাতি কন্যা পায়েল মুড়া সিংকে ধর্ষণ ও খুন এবং খোয়াইয়ে এটিটিএফ জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও।
এদিন তিনি বলেন, সিপিএম আজ বলে বেড়ান রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা নেই। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয়, তাঁদের সময় ক্রমাগত হত্যালীলার কাহিনী তাঁরা বেমালুম ভুলে গেছেন। বাম আমলে হত্যালীলার তথ্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাম জমানায় ২০০৩ সালে ১৪ আগস্ট কমলনগরে ৫টি পরিবারের সকল সদস্যকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল। তোতাবাড়িতে একইভাবে ষোলোজনকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল উগ্রপন্থীরা। বিলোনিয়ায় ৬৯ জনকে খুন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে মে মাসে এটিটিএফ নেপালটিলায় আক্রমণ চালিয়ে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছিনতাই করে। একই সালে অক্টোবর মাসে গঙ্গানগরে উগ্রপন্থীরা চারজন পুলিশ কর্মী খুন করে ষোলোটি রাইফেল ছয়শো রাউন্ড গুলি নিয়ে পালিয়ে যায়। ১৯৯৫ ষোলো জন উগ্রপন্থী উদয়পুর জেল থেকে পালিয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে চারজন সিআরপিএফকে খুন করেছিল উগ্রপন্থীরা। ধলাবিল বিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা দুইজন ইঞ্জিনিয়ারকে অপরহণ করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে স্বশাসিত জেলা নির্বাচন শেষে ব্যালেট বাক্স নিয়ে ফেরার পথে দুই ভোট কর্মীকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল।
এখানেই থেমে না থেকে তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে মরাছড়ায় গ্রামবাসীকে খুন করে এই উগ্রপন্থীরা। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে সদর উত্তরের হেজামারাতে পোলিও অভিযানে স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা দেবার কাজে নিযুক্ত ছয় জন সিআরপিএফ জওয়ান উগ্রপন্থার বলি হন। এটিটিএফ-র উগ্রপন্থীদের আক্রমণে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমবাসা থানাভুক্ত এলাকায় ৩৪ টি বাড়ি আগুন ধরিয়ে পরিবারের সদস্যকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তেমনি, ১৯৯৬ সালের ১৪ জুলাই দুইজন বিএসএফ জওয়ানকে হত্যা করা হয়েছে৷ ১৯৯৮ সালে সমতল পদ্মবিল এলাকায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ জনের একটি উগ্রপন্থী দল পাঁচ জনকে হত্যা করেছে। ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে রাধাবাড়িতে মারাটার লাইটিং ফেন্টি এবং এটিটিএফ-র সংঘর্ষে মেজর সন্তোষ প্রভাকর ও নায়ক কোলে প্রাণ বলিদান দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ১৯৯৮ সালে নরেন্দ্রপুর চা বাগানে পাঁচজন নিহত হন উগ্রপন্থীদের হাতে। ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট কাঞ্চনপুরে চলমান বাসের উপর গুলি ছুঁড়ে ছয়জনকে হত্যা করা হয় এবং ১৩ জন আহত হয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসে তৃষাবাড়িতে উগ্রবাদীরা আট জনকে হত্যা এবং পাঁচজনকে আহত করে এবং তাদের বাড়িঘর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে বড়মুরা বিশ্রামগঞ্জ উগ্রপন্থীর আক্রমণে ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০০০ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে চারজনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। ২০০০ সালে এপ্রিল মাসে বাগবাসায় আসাম রাইফেলসের দুই জওয়ানকে হত্যা করা হয় এবং নতুনবাজারে পাঁচ জন খুন হন। ২০০১ সালে অমরপুরে উগ্রদের চোরা গুপ্তা হামলায় এগারো জন বিএসএফ জওয়ান সেখানে প্রাণ হারান। ২০০৪ সালে জানুয়ারি মাসে রাইমাভ্যালিতে এনএলএফটি-র আক্রমণে পাঁচজন প্রাণ হারান। তেমনি ওই সালে গোবিন্দবাড়ি সড়কে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডেন্ট সহ ছয় জন বিএসএফ জওয়ান শহীদ হন। ২০০৪ সালে ৬ জুন মাসে ষাট লক্ষ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছে। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে আগরতলার বোমা বিস্ফোরণে চৌত্রিশ জন আহত হয়।
তাঁর সাফ কথা, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। রাজ্যের উন্নয়নে শান্তি একমাত্র পথ। তাই, সহবস্থানের মাধ্যমে রাজ্যের উন্নয়নে সকলকে সামিল হওয়ার আবেদন রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। যুব সমাজের প্রতি তাঁর অনুরোধ, বিভ্রান্ত হওয়ার বদলে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তবেই, অতীতের কালো দিন ত্রিপুরায় কখনোই ফিরে আসবে না।

