নয়াদিল্লি, ১৭ ডিসেম্বর : ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে বুধবার বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করেছে বিদেশ মন্ত্রক। প্রতিবেশী দেশে ক্রমাবনত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনাকে ভারত–বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি নিম্নপর্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন ব্যাপক আন্দোলনের মুখে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের আশপাশে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করছে কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী, এমন তথ্যও সামনে এসেছে।
বিদেশ মন্ত্রকের বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব বি শ্যাম বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করেন এবং তার কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তা হস্তান্তর করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে কূটনৈতিক মিশন ও পোস্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ সরকার এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ঢাকায় ভারতীয় মিশনকে ঘিরে চরমপন্থী তৎপরতা নিয়ে ভারতের “গভীর উদ্বেগের” কথা হাইকমিশনারকে জানানো হয়েছে।
ভারত একই সঙ্গে জানায়, তারা বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং “শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন” আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, বাংলাদেশের ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক এক উসকানিমূলক বক্তব্য এই তলবের অন্যতম কারণ। সোমবার ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ চাইলে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দিতে পারে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বক্তব্যে আরও অভিযোগ করেন, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলা, নির্বাচন বিঘ্নিত করার চেষ্টা এবং সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারত আশ্রয় ও সমর্থন দিচ্ছে—যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে এ ধরনের বক্তব্যকে “চরমপন্থী শক্তির তৈরি করা মিথ্যা বয়ান” বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করেনি কিংবা ভারতের সঙ্গে অর্থবহ কোনো প্রমাণ শেয়ার করেনি।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিদেশ মন্ত্রক আরও জানায়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে এবং উন্নয়ন ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে তা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের ভারতে পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে এবং তারা ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে দ্রুত গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবে ভারত জানিয়েছে, তারা কখনোই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে সংখ্যালঘু নিপীড়ন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা এবং উগ্রপন্থী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে আসছে ভারত। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে।

