ভারতে মনসুনের তাণ্ডব: ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার সতর্কতা জারি

নয়াদিল্লি, ২ সেপ্টেম্বর: ভারতজুড়ে মনসুনের প্রবল তাণ্ডবে উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্যে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার সতর্কতা জারি করেছে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর । নতুন দিল্লিতে আজ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আইএমডি-র প্রবীণ বিজ্ঞানী ডঃ আর. কে. জেনামণি জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পাঞ্জাবে আজকের জন্য জারি করা হয়েছে লাল সতর্কতা। পাশাপাশি, পূর্ব ভারতের ওড়িশা ও ছত্তিশগড়েও সারাদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

দিল্লিতে যমুনার জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরাতন আয়রন ব্রিজ বন্ধ রাখা হয়েছে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত। দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ জনগণকে গণপরিবহন ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে যাতায়াতের অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম ভারতের একাধিক রাজ্য, বিশেষ করে গুজরাটের নর্মদা, তাপি, ভালসাদ, নাভসারি, সুরাট ও বরুচ জেলায় আগামী কয়েকদিনে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে একটি নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, যা বৃষ্টির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

উত্তর ভারতের বন্যা পরিস্থিতি বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তরাখণ্ডে প্রবল বর্ষণ ও ধারাবাহিক মেঘভাঙার কারণে ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, বহু মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাঞ্জাবে বন্যায় এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ জন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। দিল্লি ও এনসিআর এলাকাতেও প্লাবন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলাধার থেকে লাগাতার জল ছাড়ার কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

আইএমডি আগামী তিন দিনের জন্য হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা ও দিল্লিতে লাল সতর্কতা জারি করেছে। কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ ২১০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হিমাচলপ্রদেশের চাম্বা, কাংড়া, কিন্নৌর, কুল্লু, মান্ডি, শিমলা, সিরমৌর ও সোলান এবং উত্তরাখণ্ডের চামোলি, চাম্পাওয়াত, দেরাদুন, নৈনীতাল, পিথোরাগড়, রুদ্রপ্রয়াগ ও অন্যান্য পার্বত্য জেলা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমতলের হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও দিল্লিতেও প্লাবনের সম্ভাবনা প্রবল।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট অফিসগুলিকে বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরগাঁওতে সোমবার ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। শহরজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে যানজট তীব্র হয়েছে। জেলার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার সমস্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এ যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, এবং স্কুলগুলিকে অনলাইন ক্লাস চালু করতে বলা হয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের ত্রিকূট পর্বতে বৈষ্ণোদেবী যাত্রা লাগাতার আটদিন বন্ধ রয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে প্রশাসন ভক্তদের সুরক্ষার কথা ভেবে যাত্রা স্থগিত রেখেছে। জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়কে বানিহাল অঞ্চলে ভূমিধসের কারণে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে মুঘল রোডে যান চলাচল এখনও স্বাভাবিক রয়েছে।

আইএমডি জানিয়েছে, মঙ্গলবার দিল্লি, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, ছত্তিশগড়, পূর্ব রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, ওড়িশা, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও সিকিমে পরবর্তী ২-৩ দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তর আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর অভ্যন্তরীণ কর্ণাটকে বজ্রবিদ্যুৎ ও দমকা হাওয়াসহ ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। পাশাপাশি, আইএমডি জানিয়েছে যে সেপ্টেম্বর মাসে মনসুনের বিদায় বিলম্বিত হবে এবং স্বাভাবিক বা তার থেকেও বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বর্তমানে দেশজুড়ে গড়ে ৬% বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যদিও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ১৮% কম বৃষ্টি হয়েছে, এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ২৭% বেশি।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি, ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরব সাগরে মৎস্যজীবীদের যাত্রা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।