কলকাতা, ২০ আগস্ট : ভারতের একাধিক রাজ্যে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বর্ষা। প্রবল বর্ষণ এবং তার জেরে উদ্ভূত দুর্যোগের আশঙ্কায় ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশজুড়ে একাধিক সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে গুজরাট, গোয়া এবং মহারাষ্ট্রের উপকূলবর্তী অঞ্চলের জন্য আজ, ২০ আগস্ট, লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, থানে, কোকণ এবং বিদর্ভ অঞ্চলেও অব্যাহত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি আরও সঙ্কটজনক করে তুলেছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ এবং পূর্ব রাজস্থানে আগামী দুই থেকে তিন দিন অতিবর্ষণের সম্ভাবনা প্রবল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, সিকিম এবং সুব-হিমালয়ান পশ্চিমবঙ্গে আগামী সাত দিন পর্যন্ত চলবে অস্থির আবহাওয়া। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের উপকূল এবং তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে।
জম্মু ও কাশ্মীর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ২৩ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্টের মধ্যে রাজ্যের দুই বিভাগেই (জম্মু ও কাশ্মীর) অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর জেরে ফ্ল্যাশ ফ্লাড, মাটিধস, পাথর গড়িয়ে পড়া এবং ক্লাউডবার্স্টের মত ঘটনার সম্ভাবনা প্রবল। ইতিমধ্যে রাজ্যের একাধিক জেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। রিয়াসি, রাজৌরি, কাঠুয়া, উধমপুর, সাম্বা, অনন্তনাগ, কুলগাম, ডোডা, কিশ্তওয়ার এবং পুঞ্চ-এ এই সময় বিশেষ সতর্কতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
আজ এবং আগামীকাল পর্যন্ত আবহাওয়া প্রধানত গরম ও আর্দ্র থাকবে, তবে ২২ আগস্ট রাতে কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের তরফে নদী, ঝর্না, পাহাড়ি রাস্তা, খোলা জমি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার জন্য স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। পর্যটকদেরও অনুরোধ করা হয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল বা দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ পরিকল্পনা এই সময় বাতিল করতে।
উত্তরাখণ্ডের একাধিক জেলায় লাগাতার বৃষ্টিতে ভূমিধস ও রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। আজকের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি রাস্তা— যার মধ্যে জাতীয় সড়কও রয়েছে— ধসের কারণে বন্ধ রয়েছে। গঙ্গোত্রী হাইওয়ের বিভিন্ন অংশে যেমন নালুপানি, ধারাসু, মাতলি, নেতলা ও হর্ষিলে এবং ইয়মুনোত্রী হাইওয়েতে কল্যাণী ও জঙ্গলাছট্টি অংশে গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ।
আবহাওয়া বিভাগ আগামী তিন দিন রাজ্যের জন্য ইয়েলো অ্যালার্ট জারি করেছে এবং জানিয়েছে যে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত, ও কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেছে।
আজ ভোররাতে হিমাচল প্রদেশের কুল্লু জেলার পীজ পাহাড়ে ক্লাউডবাস্ট হয়। প্রবল বৃষ্টিতে শাস্ত্রী নগরের ড্রেনে ধ্বংসাবশেষ জমে গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও কোনো প্রাণহানির খবর নেই, তবে জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি আজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
রাজ্য জুড়ে ৩৫৬টি রাস্তা, একটি জাতীয় সড়ক, ৮৭২টি বিদ্যুৎ ট্রান্সফর্মার এবং ১৪০টি জল সরবরাহ প্রকল্প বৃষ্টির কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। পং ড্যাম থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও না বাড়তে বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
তেলেঙ্গানায় লাগাতার বৃষ্টিতে কৃষ্ণা ও গোদাবরী নদী এবং তাদের উপনদীগুলিতে জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। শ্রী রাম সাগর, ইয়েলমপল্লী, নিঝামসাগর প্রভৃতি জলাধারগুলিতে প্রচুর জল ঢুকছে। ইতিমধ্যে বাঁধগুলির গেট খুলে জল ছাড়ার কাজ শুরু হয়েছে। ভাদ্রাচলমে গোদাবরীর জলস্তর লাল সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উত্তর ও পূর্ব তেলেঙ্গানায় অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে আদিলাবাদ, মেদাক, সাঙ্গারেড্ডি, ও সিদ্দিপেট জেলাগুলিতে তুলা ও ধানের ফসল সম্পূর্ণ জলে ডুবে গেছে। প্রশাসন ত্রাণ কাজ শুরু করেছে, বহু পরিবারকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে।
মুম্বই শহর গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০০ মিমি-র বেশি বৃষ্টিপাতের সাক্ষী হয়েছে। ফলে শহরের বহু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। ইতিমধ্যেই সমস্ত স্কুল, কলেজ এবং সরকারি অফিসে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিএমসি কমিশনার জানিয়েছেন, কুরলার ক্রান্তিনগরে মিথি নদীর জল বিপদসীমা অতিক্রম করায় ৪০০ জনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পাঁচটি এনডিআরএফ দল শহরের বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ কমিশনার জানান, ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মুম্বই-পুণে ট্রেন পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের নানদেডে বন্যাজনিত কারণে ৮ জন-সহ রাজ্য জুড়ে মোট ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিদর্ভ অঞ্চলে আজ লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মহাবালেশ্বর, সাতারা, পাটন, ওয়াই সহ একাধিক এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। কয়না বাঁধের ছয়টি গেট খুলে ৯৩,২০০ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। মোদক সাগর বাঁধ ৯৮ শতাংশ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বৈতার্ণা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন সমস্ত সম্ভাব্য সতর্কতা গ্রহণ করছে।
বর্ষা এখন ভারতের প্রায় সব অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ি রাজ্য থেকে উপকূলবর্তী অঞ্চল — সর্বত্রই জল এবং ধ্বংসের ছায়া। আবহাওয়া দফতর এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের একাধিক সতর্কতা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পর্যটক ও পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের যাত্রা পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে বলা হয়েছে। জীবনের সুরক্ষা যেন বজায় থাকে, সেই দিকেই এখন নজর রাখছে গোটা দেশ।

