কিংদাও,২৬ জুন : রক্ষা মন্ত্রী শ্রী রাজনাথ সিংহ আজ চীনের কিংদাও শহরে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের নতুন দিশা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেকটি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড অপরাধ ও অন্যায্য — এর পেছনে যে উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন। এসসিও-কে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদের মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত হয়।”
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে রক্ষা মন্ত্রী বলেন, “সন্ত্রাসবাদ এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের প্রসার, বিশেষত সেগুলির নিয়ন্ত্রণ যদি অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসবাদীদের হাতে চলে যায়, তাহলে শান্তি ও সমৃদ্ধি কখনোই একসাথে থাকতে পারে না।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যারা সন্ত্রাসকে সমর্থন করে, লালন করে, আর নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে — তাদের কড়া পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। কিছু রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করে এবং সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় দেয় — এ ধরনের দ্বিচারিতা এসসিও-এর পক্ষ থেকে কখনোই মেনে নেওয়া উচিত নয়।
শ্রী সিংহ উল্লেখ করেন, জম্মু ও কাশ্মীরের পাহলগামে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত “অপারেশন সিন্ধুর” চালিয়ে তার আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে এবং ভবিষ্যতের সীমান্ত-পার সন্ত্রাসী আক্রমণ প্রতিহত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই হামলায় ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরীহ মানুষদের টার্গেট করে গুলি করা হয়। “দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট”, যেটি লস্কর-ই-তৈয়বার এক শাখা, হামলার দায় স্বীকার করে। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদের উৎসস্থান আর নিরাপদ নয়। আমরা প্রয়োজনে তাদের লক্ষ্যবস্তু করতেও পিছপা হব না।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যারা সন্ত্রাসবাদ সংগঠিত করে, অর্থ জোগান দেয় এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে — তাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। ভারত সব সময় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে।
রক্ষা মন্ত্রী তরুণ সমাজে চরমপন্থার বিস্তার রোধে আরও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং এই কাজে এসসিও-এর আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কাঠামো-এর ভূমিকাকে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “র্যাডিকালাইজেশন রুখতে যে যৌথ বিবৃতি এসসিও নেতারা ভারতের সভাপতিত্বকালে দিয়েছিলেন, তা আমাদের অভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রতীক।”
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসীরা যেভাবে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্ত্র ও মাদক পাচার করছে, তা প্রতিরোধ করতে গেলে প্রথাগত সীমান্ত ছাড়িয়ে নিরাপত্তার নতুন মাত্রা বিবেচনায় আনতে হবে। আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে হাইব্রিড যুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মতো হুমকি জাতীয় সীমারেখা মানে না — একমাত্র সম্মিলিত পদক্ষেপেই এদের মোকাবিলা সম্ভব।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে এসসিও-এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এসসিও সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০% মানুষের আবাসস্থল এবং বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩০% অংশীদার। তাই এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
শ্রী সিংহ বলেন, বর্তমান বিশ্বে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন এবং বিশ্বায়নের গতি হ্রাস আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, ভারত বিশ্বাস করে যে সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিকতা সহযোগিতা গড়ে তুলতে ও সংঘর্ষ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “বাড়তি সংযোগ শুধু ব্যবসা নয়, পারস্পরিক বিশ্বাসও বাড়ায়। তবে এতে অবশ্যই এসসিও সনদের মৌলিক নীতিগুলি, বিশেষ করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক।”
আফগানিস্তান প্রসঙ্গে রক্ষা মন্ত্রী বলেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান অপরিবর্তিত। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ভারত অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ যেমন মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানীয় জলের নিরাপত্তা সম্পর্কেও তিনি বক্তব্য রাখেন এবং বলেন, “এই সমস্যা জাতীয় সীমান্ত মানে না, সমাধানও হতে হবে যৌথভাবে।” ভারত চালু করা কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার এই সমস্যার সমাধানে একটি যৌথ পদক্ষেপের ভালো উদাহরণ।
শেষে শ্রী রাজনাথ সিংহ ভারতের সাগর (সিকিউরিটি এন্ড গ্রোথ ফর অল ইন দ্য রিজিওন) ও মহাসাগর (মিউচুয়াল এন্ড হোলিস্টিক এডভান্সমেন্ট ফর সিকিউরিটি এন্ড গ্রোথ এক্রোস রিজিওন) ধারণা তুলে ধরেন, যা উন্নয়নের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়। তিনি এসসিও সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন এবং বলেন, “আমরা একসাথে চললেই আমাদের অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারব।”
তিনি বলেন, ভারত সবসময় ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’ নীতিতে বিশ্বাস করে, যা আমাদের প্রাচীন মূল্যবোধ ‘বাসুধৈব কুটুম্বকম’ -এর প্রতিফলন। পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক লাভই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক নীতি।

