তেহরান/জেরুজালেম, ১৩ জুন: ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে ইসরায়েল শুক্রবার ভোরে দেশটির একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় বলে জানিয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তেহরানের নিকটবর্তী মূল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানান, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা এবং সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু স্থানে বিস্তৃত, যার মধ্যে কিছু অংশ ভূগর্ভস্থও। যদিও ইসরায়েলি হামলার সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে, তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গোপনে নির্মিত হয়েছে এবং বেশ ভালোভাবে সুরক্ষিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ-এর মতে, ইরান ২০০৩ সাল পর্যন্ত একটি গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করছিল। তবে এরপর সেটি বন্ধ করে দেয়। ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের কথা অস্বীকার করে আসছে।
২০১৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক কার্যক্রমে কিছু বিধিনিষেধ আরোপে সম্মত হয়, যার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে ইরান আবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কার্যক্রম জোরদার করে।
ইরান বর্তমানে ইউরেনিয়াম ৬০% বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ করছে, যা ৯০% অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়ামের খুব কাছাকাছি। আইএইএ-এর হিসেব অনুযায়ী, এ পর্যায়ে পৌঁছানো ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করলে ছয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী হতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নাতানজ । এটি ইরানের মূল সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ জ্বালানী সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট (এফইপি) এবং একটি স্থলভাগে অবস্থিত পাইলট জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট (পিএফইপি)। এখানে প্রায় ১৬,০০০ সেন্ট্রিফিউজের মধ্যে ১৩,০০০টি সক্রিয়, এফইপি-এ ইউরেনিয়াম ৫% পর্যন্ত এবং পিএফইপি-এ ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়। ২০০২ সালে একটি নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী প্রথম এই গোপন কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে প্রকাশ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো ফোর্ডো , যা একটি পর্বতের অভ্যন্তরে অবস্থিত। এটি অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থানে নির্মিত এবং এখানে প্রায় ২,০০০ সেন্ট্রিফিউজ সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫০টি ইউরেনিয়ামকে ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করে। ২০০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স একযোগে ঘোষণা করে যে ইরান গোপনে এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে এবং আইএইএ-কে তা জানায়নি।
ইসফাহান শহরের উপকণ্ঠে রয়েছে একটি বিশাল পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্র, যেখানে ইউরেনিয়াম রূপান্তর সুবিধা এবং ইউরেনিয়াম মেটাল তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে। এই মেটাল পরমাণু বোমার কোর তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ২০২২ সালে আইএইএ এটিকে একটি “নতুন কেন্দ্র” হিসেবে চিহ্নিত করে।
খোন্দাব , যা আগে আরাক নামে পরিচিত ছিল, একটি ভারী-পানির গবেষণা রিঅ্যাক্টর। এটি প্লুটোনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী, এই রিঅ্যাক্টরের মূল অংশ নিষ্ক্রিয় করে কংক্রিট দিয়ে ভরাট করা হয়। তবে ইরান জানিয়েছে যে ২০২৬ সালে এটি নতুনভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তেহরান গবেষণা কেন্দ্র একটি গবেষণা রিঅ্যাক্টরসহ বিভিন্ন পারমাণবিক গবেষণাগারের সমন্বয়ে গঠিত, যা রাজধানী তেহরানে অবস্থিত। অন্যদিকে, বুশেহর ইরানের একমাত্র সক্রিয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা রাশিয়ান জ্বালানিতে পরিচালিত হয়। ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, ফলে এটির পারমাণবিক বিস্তার বা প্রোলিফারেশনের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
ইসরায়েলি হামলার ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভূগর্ভস্থ ও অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এখনো পরিস্কার নয়। আন্তর্জাতিক মহলে এ ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হতে পারে।

