বায়ো ই-৩ নীতি: অর্থনীতি, পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের জন্য জৈবপ্রযুক্তি

ডঃ জিতেন্দ্র সিং

প্রতিমন্ত্রী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর

সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের ভাবনাকে চিন্তায় রেখে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর পৌরহিত্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি স্বচ্ছ, সবুজ, সমৃদ্ধ এবং স্বনির্ভর ভারতের জন্য উচ্চ-কর্মক্ষমতাসম্পন্ন জৈব উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ডিপার্টমেন্ট অব বায়োটেকনোলজি বিভাগ এর অধীনে বায়ো ই-৩ (অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশের জন্য জৈবপ্রযুক্তি) নীতির অনুমোদন করেছে। এর ফলে, বিশ্বের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান মশালবাহক হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে ভারতের অগ্রণী ভূমিকা সুনিশ্চিত হবে।

উপাদান ব্যবহারের অস্থিতিশীল পদ্ধতি, অত্যধিক সম্পদ ব্যবহার এবং বর্জ্য উৎপাদন বিশ্বকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে৷ এগুলি যেমন বনের আগুন, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস। এই পরিস্থিতিতে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’র পথে ভারতকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জাতীয় অগ্রাধিকারের কথা মাথায় রেখে, ইন্টিগ্রেটেড বায়ো ই-৩ (অর্থনীতি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের জন্য জৈবপ্রযুক্তি) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন, অ-পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির সংস্থান হ্রাস এবং অস্থিতিশীল বর্জ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জিং পটভূমিকায় দাড়িয়ে সুস্থায়ী বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক এবং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্ণিত হবে। এই নীতির একটি প্রধান লক্ষ্য হ’ল রাসায়নিক শিল্পগুলিকে আরও সুস্থায়ী জৈব-ভিত্তিক শিল্প মডেলে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করা। এটি একটি বৃত্তাকার জৈব-অর্থনীতির প্রসার করবে এবং বায়োমাস, ল্যান্ডফিল, গ্রিনহাউস গ্যাস ইত্যাদি থেকে বর্জ্য ব্যবহারকে উৎসাহিত করে নেট-শূন্য কার্বন নির্গমন অর্জনে উৎসাহিত করবে।

এছাড়াও, বায়ো ই-৩ নীতি ভারতের জৈব অর্থনীতির বিকাশকে উৎসাহিত করার জন্য অভিনব পন্থার উদ্ভাবন করবে৷ জৈব-ভিত্তিক পণ্যসমূহের মাত্রার উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণকে সহজতর করবে; বর্জ্য পদার্থ হ্রাস, পুনঃব্যবহার এবং পুনঃগঠন করবে; ভারতে অত্যন্ত দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়তে; কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি করতে; এবং উদ্যোক্তাদের গতি জোরদার করতে সক্ষম হবে। নীতিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে: ১) উচ্চ-মূল্যের জৈব-ভিত্তিক রাসায়নিক, বায়োপলিমার এবং এনজাইমগুলির মতো বিষয়কেন্দ্রীক ক্ষেত্রগুলিতে দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়ন-কেন্দ্রিক উদ্যোক্তাদের উৎসাহ; স্মার্ট প্রোটিন এবং কার্যকরী খাবার; যথার্থ বায়োথেরাপিউটিক্স; জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি; কার্বন ক্যাপচার এবং এর ব্যবহার; এবং সামুদ্রিক এবং মহাকাশ গবেষণায় উৎসাহ এবং সহায়তা প্রদান ২) বায়োম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি, বায়োফাউন্ড্রি ক্লাস্টার এবং বায়ো-আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (বায়ো-এআই) হাব স্থাপনের মাধ্যমে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত করা; ৩) নৈতিকতার উপর জোর দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পুনরুত্পাদনশীল মডেলগুলিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা৷

গত দশকে ভারত শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নজির তৈরি করেছে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে বিশ্ব নেতৃত্বে প্রদানের ক্ষেত্রে উঠে আসার অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের জৈব অর্থনীতি ২০১৪ সালের ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ গুণ বেড়ে ২০২৪ সালে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এর বাজারমূল্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিভিন্ন খাতে বায়ো ই-৩ নীতি বাস্তবায়নের ফলে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’ প্রচারের সময় দেশের জৈব অর্থনীতি আরও জোরদার হতে পারে। দেশের উচ্চ-পারফরম্যান্স বায়োম্যানুফ্যাকচারিং উদ্যোগকে লালন করার ফলে উদীয়মান প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে এর ভিত্তি স্থাপন করা হবে। জৈব উৎপাদন ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে চলেছে এবং একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা পূরণে একটি রূপান্তরমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। একটি বহুমুখী প্রচেষ্টা হিসাবে, এটি ন্যূনতম কার্বন দৃশ্যমানতার সাথে সাশ্রয়ীভাবে জৈব-ভিত্তিক পণ্য বিকাশের জন্য মানব কোষ সহ জীবাণু, উদ্ভিদ এবং প্রাণী কোষের সম্ভাবনা উন্মোচন করার ক্ষমতা রাখবে।

পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যে এই বায়োম্যানুফ্যাকচারিং হাবগুলি কেন্দ্রীভূত সুবিধা হিসাবে কাজ করবে যা উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জৈব-ভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন, বিকাশ এবং বাণিজ্যিকীকরণ করবে। এই ব্যবস্থা এমন একটি সম্প্রদায় তৈরি করবে যেখানে জৈব উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলির সক্ষমতা, সুস্থায়ী এবং উদ্ভাবন পরিচালানোর জন্য সম্পদ, দক্ষতা এবং প্রযুক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ নিতে পারে। এই বায়োম্যানুফ্যাকচারিং হাবগুলি জৈব-ভিত্তিক পণ্যগুলির ‘ল্যাব-টু-পাইলট’ এবং ‘প্রাক-বাণিজ্যিক স্কেল’ উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে দেবে। স্টার্ট-আপগুলি এক্ষেত্রে অভিনব ধারণা নিয়ে আসতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোগ (এসএমই) ও প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের মধ্যে তা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এই প্রক্রিয়াটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বায়োফাউন্ড্রি জৈবিক প্রকৌশল প্রক্রিয়া মানে উন্নত ক্লাস্টার তৈরি করা, যা – প্রাথমিক নকশা তৈরি করা এবং পরীক্ষার পর্যায় থেকে পাইলট এবং প্রাক-বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যন্ত বোঝায়। বিভিন্ন ধরণের অ্যাপ্লিকেশনের জন্য এমআরএনএ-ভিত্তিক ভ্যাকসিন এবং প্রোটিনের বৃহৎ আকারের উৎপাদন কিছু প্রশংসনীয় উদাহরণ যার জন্য বায়োফাউন্ড্রিগুলি মূল্যবান হতে পারে। এই ক্লাস্টারগুলি প্রমিত এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলি ব্যবহার করে জৈবিক ব্যবস্থা এবং জীবের নকশা, নির্মাণ এবং পরীক্ষায় বিশেষজ্ঞ হবে।

বায়ো-এআই হাবগুলি গবেষণা ও উন্নয়নে এআইয়ের সংহতকরণকে উৎসাহিত করার জন্য একটি ফোকাল পয়েন্ট হিসাবে কাজ করবে। এই বায়ো-এআই হাবগুলি এআই এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বৃহৎ আকারের জৈবিক ডেটা সংহতকরণ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের জন্য বায়োটেকনোলজিকাল দক্ষতা, কাটিং-এজ পরিকাঠামো এবং লজিস্টিক সহায়তা সরবরাহ করবে। এই সংস্থানগুলি বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের কাছে উপলদ্ধ করে তোলা (উদাহরণস্বরূপ জীববিজ্ঞান, মহামারীবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ডেটা বিজ্ঞান)  উদ্ভাবনী জৈব-ভিত্তিক পণ্য তৈরিতে সহায়তা করবে৷ এটি জিন থেরাপির একটি নতুন জাত বা একটি নতুন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিকল্প হতে পারে।

এই সমন্বিত উদ্যোগগুলির মাধ্যমে, বায়ো ই-৩  নীতি কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি করবে, বিশেষ করে টায়ার -২ এবং টায়ার -৩ শহরগুলিতে, যেখানে বায়োমাস উৎসগুলিতে বায়োম্যানুফ্যাকচারিং হাব স্থাপন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই সুসংহত নীতি জাতির ‘বিকশিত ভারত’-এর সংকল্পে ভূমিকা রাখবে। এই নীতি জাতি গঠন ও উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখতে পারে এমন একটি মানদণ্ড হিসাবে কাজ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *