বাংলাদেশে সকলের অধিকার সমান, বিভক্ত হয়ে অধিকার আদায় নয়, সংখ্যালঘুদের বার্তা ড. ইউনুসের

হিন্দুদের ওপর সংগঠিত হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করারও প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টার।। রাজীব দে ।।ঢাকা, ১৩ আগস্ট (হি.স.) : বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান সহ সব ধর্মাবলন্বীদের অধিকার সমান। অধিকার আদায়ে বিভক্ত হয়ে নয়, সংখ্যালঘুদের বার্তা দিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস।আজ মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টায় আচমকা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। মন্দিরে তাঁকে উষ্ণ স্বাগত জানান হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। মন্দিরে সনাতনী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকও করেন ড. ইউনুস। বৈঠক থেকে এই আহ্বান জানান তিনি।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস নিজেদের সংখ্যালঘু হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে, দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে সাংবিধানিক অধিকার চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। হিন্দুদের ওপর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের সংগঠিত হামলার সঙ্গে দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমার আসার কার, একটা বড় ধরনের বিভেদের আওয়াজ শুনছি। বিমানবন্দরে নেমেই বলেছিলাম, এমন বাংলাদেশ আমরা করতে চাচ্ছি যেখানে আমরা এক পরিবার হয়ে সবাই থাকব। হিন্দু তথা সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু বলে কিছুই থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘এটা হলো মূল বিষয়। পরিবারের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকা, বিভেদ থাকার কোনও প্রশ্নই আসা উচিত নয়। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, এটাই আমাদের পরিচয়, এটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এটা নিয়ে যেন আর কোনও বাদ-বিবাদ না হয়।’ড. ইউনুস বলেন, ‘আমাদের গণতান্ত্রিক যে আকাঙ্ক্ষা, সেখানে আমরা মুসলমান হিসেবে নই, হিন্দু হিসেবে নই, বৌদ্ধ হিসেবে নই, মানুষ হিসেবে বিবেচিত। আমাদের সকলের জন্য সব অধিকার নিশ্চিত হোক। সব সমস্যার মূল হলো, আমরা যত প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনগুলো করেছি, সব কিছু কিন্তু পঁচে গেছে। এ জন্যই গোলমাল হচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনগুলো ঠিক করতে হবে।’

নোবেলজয়ী ড. ইউনুস বলেন, ‘ন্যায়বিচার হলে কেউ বিচার পাবে না কেন? আইনে কি বলা আছে, এই সম্প্রদায়ের হলে এই আদালতে যাবে, ওই সম্প্রদায়ের হলে ওই আদালতে? আইন সকলের এক, কার সাধ্য, সেখানে বিভেদ করে? এর রকম এক, ওর রকম ওই। এটা হতে পারে না কখনও।’সনাতনীদের উদ্দেশ্য করে ড. ইউনুস বলেন, ‘এটা এমন রোগ, এর মূলে যেতে হবে। আপনারা যদি বলেন, আমাদের সংখ্যালঘু হিসেবে এটা বলছে, তা-হলে বলব, এটা হলো মূল সমস্যা থেকে আপনারা দূরে সরে যাচ্ছেন। আমাদের বলতে হবে, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেটা পেলে আমাদের বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে, যেগুলো আছে, আমরা নতুন কিছু বলছি না। আমাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা যদি টেনে নিয়ে আসেন, আমি অমুক, আমি তমুক, তা-হলে আবার পুরনো খেলায় চলে গেলেন। আপনাদের শিকার করার জন্য যারা বসে আছে, তারা এগুলো শিকার করে। আপনারা বলবেন, আমরা বাংলাদেশের মানুষ, আমার সাংবিধানিক অধিকার এই, আমাকে তা দিতে হবে। সব সরকারের কাছে এটাই চাইবেন, আপনারা আর কিছু চাইবেন না।’বৈঠকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের তৃণমূল স্তরের কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আপনি শুনবেন না গ্রামীণ ব্যাংকের ইতিহাসে আমরা হিন্দুপাড়া বলে বাদ দিয়ে মুসলমান পাড়ায় গিয়েছি। এক সঙ্গে গিয়েছি, একভাবে গিয়েছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল কাজে যেতে হবে। আপনাদের অনুরোধ, আপনারা বিভিন্ন খোপের মধ্যে চলে যাইয়েন না। এই খোপ হইলেই মারামারি-কাটাকাটি লেগে যাবে। একত্রে আসেন, এক আইন, এক মানুষ, এক অধিকার। এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না।’

সব শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আপনারা আমাদের একটু সাহায্য করেন, ধৈর্য ধরেন। করতে পারলাম কি, আর কী পারলাম না, সেটা পরে বিচার করবেন।’