আগরতলা, ১৮ ফেব্রুয়ারি: গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতের আধারে নিজ বাড়ির অনতিদূরে খুন হয়েছিল প্রাক্তন সেনা জওয়ান হরিলাল দেববর্মা। পরদিন সাতসকালে তার রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধারে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। ওই খুনের সাথে জড়িত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
প্রাক্তন সেনা জওয়ানের মৃতদেহ উদ্ধারের পরপরই তার পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ তোলা হয়। পুলিশ কালবিলম্ব না করেই ঘটনার প্রাথমিক রূপরেখায় সরাসরি খুনের মামলা হাতে নিয়েই তদন্তে নামে। গত এক সপ্তাহে কল্যানপুর থানার ওসি ইন্সপেক্টর তাপস মালাকার নিজের বুদ্ধিমত্তায় একাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে থানায় এনে জোর জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়। এরই মধ্যে পুলিশের জালে ধরা পড়ে এলাকার রাবার ব্যবসায়ী মঙ্গল গোয়ালা। প্রাথমিক সূত্র পেয়েই খুনকান্ডে যুক্ত সন্দেহে তাকে আটক করে খোয়াই আদালতে বিচারকের অনুমোদনে তিন দিনের জন্য রিমান্ডে নিয়ে আসে। থানায় পুলিশের দফাওয়ারি জিজ্ঞাসাবাদে শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়ে মঙ্গল গোয়ালা।
অকফটে স্বীকার করে শুধুমাত্র ব্যানার টাকা না দিতেই সম্পূর্ণ পরিকল্পনা করে প্রাক্তন সেনা জোয়ানকে খুন করে সে। রবিবার সকালে খোয়াই মহকুমার সিনিয়র ডিসিএম (ম্যাজিস্ট্রেট) এর উপস্থিতিতে মঙ্গল গোয়ালা খুন কান্ডের পুরো ঘটনার জবানবন্দি দেয়। দেখা গেছে দীর্ঘ এক বছর যাবত এই মঙ্গল অনলাইনে জোয়ার নেশায় মত্ত হয়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মোটা টাকা ধার করে। ইদানিং জুয়ায় সর্বস্বান্ত হতে গিয়ে নিজের রাবার ব্যবসায় প্রাক্তন সেনা জোয়ানের কাছ থেকে রাবার শিট ক্রয় বাবদ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা দেনা করে। ইতিমধ্যেই দেনার টাকা পরিশোধে মঙ্গলকে চাপ দিতে থাকলে সে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে থাকে। এরই মধ্যে মঙ্গল প্রাক্তন সেনা জোয়ান হরিলাল দেববর্মাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেয়। যথারীতি পরপর দুদিন রাতের আঁধারে হরিলাল দেববর্মাকে খুন করতে গিয়েও নির্জন পথে মানুষের আনাগোনা থাকায় খুনের ছক ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত গত ৯ই ফেব্রুয়ারি রাত আটটা নাগাদ গ্রামীণ বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে নৃশংসভাবে খুন হয় প্রাক্তন সেনা জওয়ান।
অভিযুক্তের কথা অনুযায়ী দেনার টাকা পরিশোধ করতে তার কাছে একমাত্র প্রতি ছিল রাবার ব্যবসায়ী তথা প্রাক্তন সেনা জোয়ানকে খুন করা। আজ পুলিশের জাম্বু বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেটকে সাথে নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছে অভিযুক্তের মহড়ায় কোন কান্দে ব্যবহৃত বাঁশের ফাইল একটি কর্দমাক্ত ডোবা থেকে উদ্ধার করে আনে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে কল্যাণপুর থানা কেইস নং- ০৩/২০২৪ আন্ডার সেকশন ৩০২ আই পি সি ধারা মোতাবেক গ্রেপ্তার করে খোয়াই আদালতে তোলা হয়। বিচারক অভিযুক্তকে জেলহাজতে প্রেরণ করে। উল্লেখ্য খোয়াই জেলার কল্যানপুর থানাধীন জলাইতিশা এডিসি ভিলেজের কালিকৃষ্ণ পাড়ার বাসিন্দা হরিলাল দেববর্মা পিতা মৃত ব্রজেন্দ্র দেববর্মা বয়স ছাপান্ন। দীর্ঘ বছর দেশ রক্ষায় সেনাবাহিনীতে বেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে অবসরে আসেন। নিজের গ্রামের বাড়িতে অবসর কালীন সময়ে বাড়ি লাগোয়া নিজের রাবার বাগানে কাজকর্ম করেই বেশ ভালো ভাবেই জীবন যাপন করছে। প্রতিদিনের মতোই গত ৯ই ফেব্রুয়ারি পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। পরদিন তার বাড়ি থেকে প্রায় শতাধিক মিটার দূরে স্হানীয় মানুষ জলাশয়ে তার মৃতদেহ দেখতে পায় স্হানীয় মানুষ। কল্যাণপুর থানার পুলিশ প্রশাসনকে ঘটনার খবর দিলে পুলিশ অকুস্থলে পৌঁছে জলাশয় থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। তার মাথায় একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পুলিশ প্রশাসন ঘটনাটি খুনকান্ডের সন্দেহে ডগ স্কোয়াড টিম ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দলকে তদন্তের জন্য তলব করে আনলেও সেইদিন ফলাফল অশ্বডিম্ব। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশ নিজেদের তদন্তের জাল বিস্তার করে ঘটনার দশ দিন পর মূল অভিযুক্তকে তথ্য প্রমান সহ গ্রেপ্তার করে সফলতা পায়। ২০২৩ সালে কল্যাণপুর থানা এলাকায় পাঁচটি খুনের ঘটনায় সব কটিতেই ওসি ইন্সপেক্টর তাপস মালাকারের প্রচেষ্টায় মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। আজকের সফলতায়ও স্থানীয় জনমানুষে পুলিশের ভূমিকায় স্বস্তি দেখা দেয়।