ধর্মনগর সেজে উঠেছে পূজার আমেজে, স্থানীয় ক্লাবগুলোতে চরম ব্যস্ততা

নিজস্ব প্রতিনিধি, ধর্মনগর, ৯ অক্টোবর :  হাতে গোনা গোটা দশটা দিন রয়েছে বাঙালির মহোৎসব দুর্গোৎসবের। বৃষ্টির যে প্রকোপ ছিল তাকে কাটিয়ে আবহাওয়া ঠিক দুর্গোৎসবের সময় যেমনটা হতে হয় তারই রূপ নিতে চলেছে। শহরে না থাকলেও আশপাশে কাশফুলের দোল শুরু হয়ে গেছে। ভোর না হতেই শিউলির গন্ধে মাতিয়ে দিচ্ছে মন প্রাণ। বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়েছে একটা পূজা পূজা গন্ধ। পদ্মের কলিগুলি প্রস্ফুটিত হয়ে উঁকি দিচ্ছে কখন মা আসবে। তারুণ্যের মধ্যে হাতছানি দিচ্ছে একটা পূজা পূজা গন্ধ। রাত পোহালেই চলে আসবে পিতৃপক্ষের অন্তিমক্ষন মাতৃপক্ষের শুরু। মূর্তি পাড়ায় প্রতিমাগুলির কাজ প্রায় শেষ। তবুও শিল্পীরা শেষ মুহূর্তে তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন স্থাপনের জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে শেষ প্রলেপটা দেবেন তারই অপেক্ষায়।
উত্তর জেলা সদর ধর্মনগর খুব একটা বড় বা জাঁকজমকপূর্ণ শহরে এখনো পরিণত হয়নি। তবে একটা সুস্থ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে এই শহরের গায়ে লাগানো। শত পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতির মধ্যেও ধর্মনগর এখনো প্রাচ্যের সংস্কৃতি বহন করে এগিয়ে চলেছে। যারা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বাহক এখনো তারা এই শহরে অপান্থেও। এমন একটা ছোট্ট শহর ধর্মনগর যেখানে একদিকে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া তেমনি অন্যদিকে রয়েছে সেই গ্রামীন সংস্কৃতি যাকে নির্ভর করে বাঙ্গালী দীর্ঘজীবন ধরে বুক চিটিয়ে সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করে আসছে। তাই এখনো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব আসলে মানুষের মধ্যে একটা আনন্দের দোলা দেয়। ব্যবসায়িক দিককে চিন্তার বাইরে রেখে একটা অফুরন্ত আনন্দ মানুষের মধ্যে এখনো জেগে উঠে। আর এই আনন্দকে সাঙ্গ করে ক্লাব এবং বারোয়ারি পুজোগুলি যে যার মত নিজেদেরকে তৈরি করে নিচ্ছে শেষ সময়ের তুলির টানের জন্য। এই শহরে বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের পূজার পাশাপাশি মাঝারি এবং ছোট বাজেটের পূজা রয়েছে। শহরের উত্তর দিক থেকে শুরু করলেন পদ্মপুর ক্লাব একটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। সাধারণত থিমের পূজার উপর এরা বিশ্বাসী। ধর্মনগরের মানুষকে প্রতি বছর কিছু না কিছু নতুনত্ব প্রদান করা এদের নামচায় পরিণত হয়ে গেছে। একদিকে যেমন পদ্মপুর ক্লাব তেমনি ধর্মনগর কৈলাশহর রাস্তা ধরে রয়েছে ক্লাব কনসেনসাসের জেলরোড সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির নিবেদন। যাদের পূজা অনেকটা কাল্পনিক মন্দির কে ভিত্তি করে সু উচ্চ অট্টালিকা তার মধ্যে যুক্ত হয় বাঙ্গালী সংস্কৃতির এবং হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন নকশার কারিগরি। শহরের পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এগিয়ে চলোর পূজা মন্ডপ। এরাও ধর্মনগরবাসীকে নতুনত্ব প্রদান করে থিমের উপর নিবেদন করে বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এই পূজা শুধুমাত্র একটি ক্লাবের পূজা নয়। বলা যায় পুরো রাজবাড়ী এলাকার মানুষের সমন্বয়ে এই পূজার আয়োজন। শহরের মধ্যপ্রান্তে রয়েছে মধ্যশহর সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি নিবেদন। সবাইকে পেছনে ফেলে রবীন্দ্রনাথ যেমন করে বাঙ্গালী সমাজকে উৎকৃষ্ট করে এগিয়ে দিয়েছিল সেই মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে এরাও নতুনত্ব উপহার দেয় ধর্মনগর বাসীকে। অনেকটা উন্নত চিন্তাধারায় এদের পূজা  নিবেদিত হয়। একটু এগিয়ে যেতে ই চলে আসে হাসপাতাল রোডে দীর্ঘদিনের সম্ভ্রান্ত ক্লাব বলে পরিচিত নবরাগ সংঘের নিবেদন। জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থান সংকুলতার জন্য এদের পূজা মন্ডপ অল্প পরিসরে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। এদের আলোকসজ্জা এবং কাল্পনিক প্রতিকৃতি মানুষকে বারে বারে আসতে বাধ্য করে। তার থেকে সামান্য এগিয়ে গেলে অর্থাৎ শহরের প্রায় উত্তরপ্রান্তে ওপর একটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব হচ্ছে আপনজন ক্লাব। দীর্ঘদিন ধরে একটা মান্যতা বজায় রেখে উচ্চ পর্যায়ের শিল্প নিদর্শন করে যাচ্ছে এই আপনজন ক্লাব। এই ক্লাবের পূজাতে শিল্প নিদর্শন এর পাশাপাশি থাকে উৎকৃষ্ট শিল্পীদের দ্বারা প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। যা দেখতে উপচে পড়ে লোকের ভিড়। ক্লাব প্রাঙ্গণকে আকর্ষিত করতে প্রতিবছর নতুনত্ব প্রদান করে এই ক্লাবের কর্মকর্তা এবং সদস্যরা। সরাসরি চলে আসলে শহরের উত্তরপ্রান্তে অপর একটি ক্লাবের নাম হচ্ছে নয়াপাড়া ক্লাব। এক ক্লাবের পূজার্চনা সম্পূর্ণ রূপে এলাকাবাসী ঘরের পূজা হলেও তাদের কাল্পনিক মন্দির সবাইকে একবার ভাবিয়ে তুলে। সঙ্গে থাকে এদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতি অর্চনা। এই বড় বাজেটের পুজো গুলিকে বাদ দিলে মাঝারিস্তরের পূজা বলতে রয়েছে, জয় হিন্দ ক্লাবের পূজা মন্ডপ, ধর্মপুর বিদ্যালয়ের মাঠে পিওয়াইসি ক্লাবের নিবেদন, তাছাড়া বারোয়ারি পূজা মণ্ডপ গুলি যার মধ্যে থানা রোড সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, পূর্ব থানা রোড সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, চাল বাজার ব্যবসায়ীদের সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, মাছ বাজার ব্যবসায়ীদের সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, মহশস্মৃতি রোড সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, আলগাপুর সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, কামেশ্বর সর্বজনীন পূজা মন্ডপ, রাজবাড়ী সর্বজনীন পূজা মন্ডপ এবং শহরতলীর প্রতিটি গ্রামের সর্বজনীন পূজা মন্ডপ মানুষকে আকর্ষণীয় করে তুলে। সবার সাথে তাল মিলিয়ে অথচ ভিন্ন স্বাদের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যবাহী পূজা বলতে ধর্মনগর শহরের টাউন কালীবাড়ি পূজা কে বুঝায়। এখানে মানুষ মানুষের ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি হয় সাথে চলে ঢাক শিল্পীদের কারিগরি সমারোহ। উলুধ্বনি, আলপনা, শঙ্খধ্বনি এবং আরতির প্রতিযোগিতা চলে প্রতিদিন এখানে। তাদেরকে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় এই টাউন কালিবাড়ি প্রাঙ্গণ। তাছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশনের বিশুদ্ধ পথে পূজা অর্চনা, অফিসটিলা কালিবাড়ির দুর্গাপূজা, নয়াপাড়া কালীবাড়ির দুর্গাপূজা মানুষের মধ্যে আনন্দের যোগান দিয়ে যায়। এদের পাশাপাশি রয়েছে রাগনা গ্রাম পঞ্চায়েতে শত বছরের পুরনো এক বাড়ির দুর্গাপূজার আয়োজন। সব মিলিয়ে এক অফুরন্ত আনন্দের সমারোহ বিকশিত হয়ে পড়ে আবাল বৃদ্ধ বণিতা যারা ধর্মনগরে বসবাস করে তাদের মধ্যে। তাই এই ছোট শহরের পূজার জন্য বছরে একবার প্রতিটি ঘরে ঘরে যারা বহিরাজ্যে বা বহিদেশে কর্মরত তারা তাদের সব কাজকর্ম ফেলে চলে আসে আনন্দ বিনোদনে নিজের শহর ধর্মনগরে।