ক্যানিং, ১৪ জুন (হি. স.) : মনোনয়ন জমার পঞ্চম দিনে ফের রনক্ষেত্রের চেহারা নিল দক্ষিন ২৪ পরগনার ক্যানিং। এদিন সকালে ক্যানিং হাসপাতাল মোড় এলাকায় মনোনয়ন জমা নিয়ে তৃণমূলের দুই পক্ষের মধ্যেই ব্যাপক বোমাবাজি হয়। গুলিও চলে। ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুই তৃণমূল কর্মী। আহতদেরকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশকে ব্যাপক লাঠিচার্জ করতে হয়। ঘটনায় এসডিপিও ক্যানিং দিবাকর দাস সহ বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মীও গুরুতর জখম হয়েছেন। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বুধবার বিকেল পর্যন্ত এলাকার তৃণমূল নেতা অর্ণব রায় সহ মোট ১৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
গত কয়েকদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে শাসক বিরোধী বিবাদ, সংঘর্ষ লেগে রয়েছে। মঙ্গলবারও ক্যানিং বিডিও অফিসে বিজেপি প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিতে এলে তাদের উপর চড়াও হয় তৃণমূল। পুলিশের সামনেই বেধড়ক মারধর করে বিডিও অফিস থেকে বের করে দেয় তারা। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে বুধবার সকালে এই মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে শাসক দলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বোমা, গুলি চলতে থাকে মুড়ি মুরকির মতো। পাশাপাশি দুপক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইট বৃষ্টি করতে থাকে। এই ঘটনায় সুনীল হাওলাদার ও সফিউদ্দিন মোল্লা নামে দুই তৃণমূল কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সুনীলের পায়ে ও সফিউদ্দিনের পেটে গুলি লেগেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ক্যানিং ১ ব্লক তৃণমূলের নেতা শৈবাল লাহিড়ী অনুগামীদের নিয়ে ট্রেনে করে ক্যানিং স্টেশানে নামেন। সেখান থেকে সঞ্জয়পল্লী হয়ে ক্যানিং হাসপাতাল মোড়ে আসেন মিছিল করে। পাশাপাশি তালদি, হাটপুকুরিয়া, গোপালপুর, ইটখোলা, নিকারিঘাটা সহ আশপাশের এলাকা থেকেও তৃণমূল কর্মীরা এসে হাসপাতাল মোড়ে যোগ দেন শৈবালের সাথে। অন্যদিকে ব্লক তৃণমূলের আরেক নেতা তথা বিধায়ক পরেশ রাম দাসের দাদা উত্তম দাস দলীয় কর্মীদের নিয়ে বাসস্ট্যান্ড চত্বরে জমায়েত করেন এদিন সকাল থেকেই। উদ্দেশ্য ছিল শৈবাল অনুগামীদের কোনভাবেই মনোনয়ন জমা দিতে দেবেন না তারা।
তাঁর অভিযোগ, “ এই শৈবাল লাহিড়ী বিজেপির লোক। গত বিধানসভা নির্বাচনে সে বিজেপির হয়ে কাজ করেছে বিজেপির প্রার্থী অর্ণব রায়কে সাপোর্ট করেছে দলের প্রার্থীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ কথা প্রমানিত। সেই বিজেপির লোক কিভাবে তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে দলের নামে মনোনয়নের জন্য এসেছে?” এই পরিস্থিতিতে বাসস্ট্যান্ড টপকে বিডিও অফিসে মনোনয়ন জমা দিতে যেতে না পেরে ক্যানিং হাসপাতাল মোড়ে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন শৈবাল ও তাঁর অনুগামীরা। ক্যানিং বারুইপুর, ক্যানিং হেরোভাঙা রোড অবরোধ করেন তাঁরা। বাসস্ট্যান্ড থেকে লোক না সরালে তাঁরা এই অবরোধ তুলবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন। এভাবেই শ্লোগান, পাল্টা শ্লোগান চলতে থাকে এলাকায়। রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ। এলাকায় সামান্য কিছু পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তাঁরা কার্যত নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন সেই মুহূর্তে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তমের নেতৃত্বে প্রচুর তৃণমূল কর্মী হাসপাতাল মোড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ক্যানিং মা ও শিশু হাসপাতাল মাতৃমার সামনে দুপক্ষই বোমাবাজি শুরু করে। চলে গুলি। এলোপাথাড়ি ইটবৃষ্টিও দুপক্ষের মধ্যে। ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। হাসপাতালের রোগী থেকে শুরু করে এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী সকলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে দুপক্ষের মধ্যে চলে এই সংঘর্ষ। এরপর বিশাল পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে এসে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শৈবালের দাবি, “ দলের পুরাতন কর্মী, যারা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল করছে আমি তাঁদের মধ্যে একজন। কংগ্রেস আমল থেকেই দিদির সাথে দল করি। তাঁর আদর্শেই আজ পর্যন্ত এই তৃণমূলের ঝান্ডা ধরে রয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “আমি এখনও ব্লক তৃণমূলের সভাপতি, দলের প্রার্থীদের নিয়ে তাই মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছিলাম। ওঁরা বাসস্ট্যান্ড দখল করে রেখেছে যাতে আমরা নমিনেশান জমা দিতে না পারি। আমরা অশান্তি চাইনা বলেই পুলিশকে জানিয়ে হাসপাতাল মোড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলাম, বিভিন্ন অঞ্চল নেতৃত্বরাও ছিলেন। কিন্তু সেই সময় আচমকা একদল গুন্ডা বোমা, বন্দুক নিয়ে আমাদের উপর হামলা করে। আমাদের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। ইট পাটকেল ছোড়ে, তাতে অনেকে জখম হয়েছেন।”
তাঁর আরও অভিযোগ, পুলিশও কার্যত বিনা অপরাধে তাঁদের কর্মীর উপরেই লাঠি চালিয়েছে, আটক করেছে। অথচ যারা বোমা, বন্দুক নিয়ে এই হামলা চালাল তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন ব্যবস্থাই নেয় নি। এসডিপিও দিবাকর দাস বলেন, “ হাসপাতাল মোড় চত্বরে দুই পক্ষের মধ্যে বোমাবাজি, ঝামেলা হয়েছে। দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী জখম হয়েছেন। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে। কারা এই অশান্তি ছড়াল সেটা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এ প্রসঙ্গে ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশ রাম দাস বলেন, “ আমি তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক, আমি এই বিধানসভার চেয়ারম্যান, আমাদের ছেলেরা কাউকে মারেনি, আমরা নমিনেশান করেছি। যারা মার খেয়েছে, বোমাবাজি করেছে, যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই বহিরাগত। পুলিশ সব দেখেছে, ভিডিও ফুটেজ আছে পুলিশ সেই ফুটেজ দেখে দোষীদের গ্রেফতার করুক।” তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ অবশ্য মানতে চাননি বিধায়ক, তিনি বলেন, “ পশ্চিমবঙ্গের কোথাও তৃণমূলের সাথে তৃণমূলের লড়াই হচ্ছে না। আজ সকালে বিজেপি নেতা শৈবাল লাহিড়ী ও গত বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী অর্ণব রায়ের নেতৃত্বে বেশ কিছু বহিরাগত দুষ্কৃতীরা বন্দুক ও বোমা নিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস ছড়াতে থাকে। এই ১৪৪ ধারা অবস্থায় পুলিশ তাঁদের হটাতে গেলে ধ্বস্তাধস্তি হতে নিজেদের গুলিতেই তাঁদের দুজন জখম হয়েছে। বিজেপি, আইএসএফ একত্রে এসে এদিন শান্ত ক্যানিংকে অশান্ত করেছে আজ।”
বিজেপি নেতা সুনিপ দাস বলেন, “ গতকাল আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে দেয়নি তৃণমূল। আজ তৃণমূল নেতা শৈবাল লাহিড়ীর অনুগামীদের উপর হামলা চালায় পরেশের লোক। এটা আসলে পেটের লড়াই। পঞ্চায়েতের টাকা কোন তৃণমূল নেতা খাবে সেই লড়াই এটা। নিজেদের লড়াইয়ে এঁরা বিজেপিকে জড়াতে চাইছে।”