আগরতলা, ১২ আগস্ট (হি.স.) : ত্রিপুরায় জাতি-জনজাতির মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাঞ্চনপুরে স্থানীয় স্বয়ংসেবক-রা ‘সদ্ভাবনা মঞ্চ’ নামের এক গঠন করেছেন। মঙ্গলবার ওই মঞ্চের সদস্যরা কতিপয় দুষ্কৃতীর হামলায় আক্রান্ত হয়েছেন। উত্তর ত্রিপুরা জেলা সংঘচালক বিবেকানন্দ ভট্টাচার্য সহ নয় (৯) স্বয়ংসেবক হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। সদ্ভাবনা মঞ্চের তরফে ‘নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চ’-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে কাঞ্চনপুর থানায় এফআইআর করা হয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত ওই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনাকে ঘিরে কাঞ্চনপুরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি রঞ্জিত নাথ তাঁদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। ঘটনার সাথে নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চ কোনওভাবেই যুক্ত নয় বলে তিনি দাবি করেছেন। আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেছে। আগামী ১৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে।
ত্রিপুরায় জাতি-জনজাতির ঐক্যের মেলবন্ধনের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে, বিভেদকামী শক্তির আস্ফালনে রাজ্যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গাও হয়েছে। তবুও, ত্রিপুরায় জাতি-উপজাতি মিলেমিশে রয়েছেন। কিন্তু মাঝে-মধ্যেই ঐক্যের প্রাচীরে চিড় ধরানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাঞ্চনপুরে রিয়াং শরণার্থী ইস্যুতে পরিস্থিতি জটিল রূপ ধারণ করেছে। তাই শান্তিপ্রিয় ত্রিপুরাবাসী পরিবেশ শান্ত হোক চাইছেন। সেই লক্ষ্যে স্থানীয় স্বয়ংসেবক-রা মিলে ‘সদ্ভাবনা মঞ্চ’ গড়েছেন। বাঙালি এবং জনজাতিদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই এই মঞ্চের আবির্ভাব হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রান্ত প্রচারক তাপস রায়।
তাপস রায় বলেন, কাঞ্চনপুরে বাঙালি এবং জনজাতিদের মধ্যে সদ্ভাবনা প্রতিষ্ঠায় একটি মঞ্চ গড়ে তোলা হয়েছে। মঞ্চের উদ্দেশ্যই হল, রাজ্যে শান্তি বজায় রাখা। কিন্তু গতকাল সদ্ভাবনা মঞ্চের বৈঠকে স্থানীয় নাগরিক মঞ্চের কার্যকর্তারা হামলা করেছেন। তাতে বেশ কয়েকজন আরএসএস কার্যকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। এ-ব্যাপারে কাঞ্চনপুর থানায় মামলা করা হয়েছে।
ঘটনা সম্পর্কে সংঘের উত্তর ত্রিপুরা জেলা কার্যবাহ বিজয় রায় বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুতে বাঙালি এবং জনজাতিদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। তাই সমাজে শান্তি-সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘সদ্ভাবনা মঞ্চ’ নামের এক অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে।
তাঁর কথায়, মানুষকে বিভ্রান্ত করে কাঞ্চনপুরে জমি তৈরি করছে নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চ। কিন্তু, সদ্ভাবনা মঞ্চের আত্মপ্রকাশে তাঁদের পায়ের তলায় মাটি সরে যাচ্ছে। তাই গতকাল আমাদের উপর তারা হামলা করেছে। তিনি বলেন, গতকাল কাঞ্চনপুর মহকুমার তিনটি স্থানে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। কাঞ্চনপুর, দশদা এবং লালজুড়ি এলাকায় কোভিড-১৯-এর সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে-মোতাবেক কাঞ্চনপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু, দশদা স্কুলে বৈঠক চলাকালীন ৩০-৪০ জনের একটি দল তাদের উপর হামলা করেছে। তাতে উত্তর ত্রিপুরা জেলা সংঘচালক বিবেকানন্দ ভট্টাচার্য সহ নয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি জানান, আহতদের প্রথমে কাঞ্চনপুর মহকুমা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, চিকিৎসকরা তাঁদের ধর্মনগর জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। বিজয়বাবু বলেন, ওই ঘটনায় কাঞ্চনপুর থানায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ধরপাকড় শুরু করেছে বলে জানা গেছে। উত্তর ত্রিপুরার পুলিশ সুপার ভানুপদ চক্রবর্তী এ-বিষয়ে বলেন, গতকাল সদ্ভাবনা মঞ্চের উপর হামলার ঘটনায় রাত থেকেই বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। তাতে সাফল্যও মিলেছে। তিনি বলেন, ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এবং মঞ্চের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার করা হয়েছে। আজই তাদের বিশেষ আদালতে সোপর্দ করা হবে। পুলিশ সুপার জানান, উত্তর ত্রিপুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফ্রাঞ্চিস ডারলং এখনও কাঞ্চনপুরেই অবস্থান করছেন। বাকি ১০ জনকে গ্রেফতারের অভিযান জারি রয়েছে।
এদিকে, সদ্ভাবনা মঞ্চের উপর হামলার অভিযোগ পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছে নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চ। মঞ্চের সভাপতি রঞ্জিত নাথ বলেন, এডিসি নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে সদ্ভাবনা মঞ্চের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। তারাই জাতি-জনজাতির মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চাইছে। গতকাল দশদায় বৈঠক চলাকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের বাধা দিয়েছেন। তাতে বাকবিতণ্ডা হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হন। কিন্তু ওই ঘটনার সাথে নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চের কেউ যুক্ত নন। মিথ্যা মামলায় তাদের ফাঁসানো হচ্ছে, দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চের কয়েকজন সদস্যকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রচুর মানুষ কাঞ্চনপুর থানা এবং আদালত চত্বরে জড়ো হয়েছেন। তাদের সাথে অবিচার হলে আগামীকাল থেকে বাজার-হাট বন্ধ রাখা হবে, হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

