
কলকাতা, ১ অক্টোবর (হি.স): রাজীব কুমার মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে সিবিআই । মঙ্গলবার হাইকোর্টে সারদা কাণ্ডে আগাম জামিন পেয়ে যান কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার ৷ মঙ্গলবার তাঁর আগাম জামিন মঞ্জুর করে হাইকোর্টের বিচারপতি শহিদুল্লা মুন্সি ও বিচারপতি শুভাশিস দাশগুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ ৷ তাই, এই রায়ের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ৷
জানা গেছে, প্রথমে এদিনের রায়ের কপি দিল্লিতে পাঠানো হবে ৷ লিগাল সেলের সঙ্গে কথা বলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করবেন সিবিআইয়ের আইনজীবীরা ৷ মঙ্গলবারই হাইকোর্টে ছিল পুজোর ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস । হাইকোর্ট অক্টোবরের শেষ দিনে খুলবে । আবার সুপ্রিম কোর্ট ৪ অক্টোবর বন্ধ হয়ে ১৪ অক্টোবর খুলবে । ফলে কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করতে হবে আগামী তিনদিনের মধ্যে । না হলে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সিবিআইকে ।
সূত্রের খবর, সিবিআই আধিকারিকরা, আইনি পরামর্শ নিয়ে রাজীব কুমারকে গ্রেফতারের তোড়জোড় করছেন । কারণ সারদা রিয়ালিটি মামলায় এদিন কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিন মঞ্জুর হলেও রোজভ্যালি কাণ্ডে রাজীব কুমারের নামে মামলা রয়েছে । সারদা এবং রোজভ্যালি মামলার পৃথকভাবে তাঁকে নোটিশ দিতে পারে সিবিআই ।
মঙ্গলবার হাই কোর্টের বিচারপতি শহিদুল্লা মুন্সি ও বিচারপতি শুভাশিস দাশগুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ রাজীব কুমারের আগাম জামিন মঞ্জুর করে ৫০ হাজার টাকার বন্ডে জামিন দেয় ৷ তবে, এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদনের রাস্তা খোলা রয়েছে সিবিআইয়ের কাছে । এদিন রায় ঘোষণার সময়, জানিয়ে দেওয়া হয় রাজীব কুমারকে যদি গ্রেফতার করা হয়, তা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে জামিন পেয়ে যাবেন । আগাম জামিন মঞ্জুর করা হলেও, কলকাতা ছেড়ে রাজীব কুমার যেতে পারবেন না বলেও রায়ে উল্লেখ করেছেন দুই বিচারপতি ।
মঙ্গলবার এই আগাম জামিন মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে আদালতের তরফে জানাল হয়েছে, হেফাজতে নিয়ে রাজ্যের গোয়েন্দা প্রধানকে জেরা করার প্রয়োজন নেই ৷ এমনকী বেশ কয়েকটি শর্তও দিয়েছেন বিচারপতি শহিদুল্লা মুন্সি ৷ তিনি জানান, সিবিআইয়ের তলবে হাজিরা দিতে হবে রাজীব কুমারকে ৷ সেক্ষেত্রে তলবের ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিতে হবে সিবিআইকে ৷ দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার ৷ এই রায়ের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবে সিবিআই ৷
গত কয়েকদিন ধরেই ‘ইন ক্যামেরা’ বা বন্ধ ঘরে চলে শুনানি । বিচারপতি শহিদুল্লা মুন্সি ও বিচারপতি শুভাশিস দাশগুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানিতে প্রথম থেকেই সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল । এরআগে, অভিযুক্ত আইপিএসের তরফে তাঁর আইনজীবী সিবিআইয়ের যুক্তির বিরোধিতা করেন । সোমবার, রাজীব কুমারের আগাম জামিনের বিরোধিতা করা হয় সিবিআইয়ের তরফে । জানা গেছে, সিবিআইয়ের যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন হাইকোর্টের বিচারপতিরা ।
আদালত সূত্রে খবর, এদিন রাজীবের আগাম জামিনের বিরোধিতা করে তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার একাধিক কারণ দর্শান সিবিআইয়ের আইনজীবী ওয়াই জেড দস্তুর ৷ তিনি জানান, শিলংয়ে জেরার সময় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন এই দুঁদে আইপিএস অফিসার ৷ গ্রেফতার হবেন না জেনে, সিবিআইয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করেননি তিনি ৷ এরপর একাধিকবার তলব করা হলেও হাজিরা দেননি ৷ এছাড়া, সারদাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত রাজ্য সরকারের সিটের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক অফিসারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও রাজীব কুমার সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়েছে সিবিআই ৷ সিবিআইয়ের আইনজীবী সওয়ালের সময় জানিয়ে ছিলেন, রাজীব কুমারকে হেফাজতে নিয়ে জেরার প্রয়োজন রয়েছে । কারণ তাঁকে ৮ বার তলব করা হলে মাত্র দু’দিন তিনি হাজিরা দিয়েছিলেন । তাও হাইকোর্টের রক্ষাকবচ থাকার সময় । সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি শিলং-এ গিয়েছিলেন । তখন তাঁকে প্রায় ৪০ ঘণ্টা জেরা করা হয়েছিল । কিন্তু রক্ষাকবচ উঠে যাওয়ার পর, তিনি হাজিরা দেননি । তাঁকে নোটিশ দেওয়া হলেও, হাজিরা না দিয়ে পালাতক ছিলেন ।
কলকাতা হাইকোর্টই রাজীব কুমারের উপর থেকে আইনি রক্ষাকবচ সরিয়ে নিয়েছিল । এরপর রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল । কিন্তু তিনি হাজিরা না দিয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন । তারপর গত ১৭ দিন ধরে আদালতে আদালতে ঘুরেছেন রাজীব কুমার । প্রথমে বারাসত সিবিআই কোর্ট । সেখানে এক্তিয়ারের প্রশ্ন ওঠায় রাজীব কুমারের আবেদন গৃহীতই হয়নি । তারপর বারাসত জজ কোর্ট । জেলা জজ জানিয়ে দেন, সারদার মূল মামলা যেহেতু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়, তাই উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলা আদালত এর শুনানি করতে পারে না । তাঁকে আবেদন করতে হলে, তা করতে হবে আলিপুর আদালতে । আলিপুর আদালতে যান বর্তমান এডিজি সিআইডি । আলিপুর আদালত রাজীব কুমারের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় । তার পরই গত সোমবার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁর স্ত্রী সঞ্চিতা কুমার । বুধবার এই মামলার প্রথম শুনানি শুরু হয় । শুক্রবারও এক দফা শুনানি হয় । সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে মামলার শুনানি শেষ হয় । তবে ওই দিন রায়দান স্থগিত রাখে ডিভিশন বেঞ্চ । এরআগে গত তিনদিন ধরে রাজীব কুমারের আগাম জামিনের শুনানি চলছিল আদালতে । সোমবার সকালেও রুদ্ধদ্বার কক্ষে, শুনানি শুরু হয় । সেখানে সিবিআইয়ের আইনজীবীরা তাঁর জামিনের বিরোধিতা করলেও সোমবারই রায় ঘোষণা হয়ে যাবে বলে মনে করা হয়েছিল । কিন্তু রায়দান স্থগিত করে দেয় ডিভিশন বেঞ্চ । মঙ্গলবার সেই রায় দেন বিচারপতি শহিদুল্লা মুন্সি ও বিচারপতি শুভাশিস দাশগুপ্ত ।

