বক্সনগরে পুটিয়া সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে যুবক নিহত, উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২২ জুন ৷৷ গুলিবিদ্ধ হয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে৷ সিপাহীজলা জেলার বক্সনগর থানাধীন পুটিয়া সীমান্তে সরিফ মিয়া(২৪) ওরফে তুহিনের গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার হয়েছে৷ বিএসএফ-র দাবি, গরু পাচার আটকাতে গিয়ে পাচারকারীদের সাথে সংঘর্ষ হয়েছে৷ তাদের থামাতে গুলি চালাতে হয়েছে৷ তাতে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে৷ কিন্তু মৃতের পরিবারের দাবি, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করা হয়েছে৷ অভিযোগ পাল্টা অভিযোগকে ঘিরে পুটিয়া সীমান্তে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে রয়েছে৷ এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে৷

বিএসএফ’র গুলিতে নিহত সরিফ মিঞা৷ ছবি- নিজস্ব

তুহিনের বড় ভাই অনিক মিয়ার দাবি, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তার ছোট ভাই খুন হয়েছেন৷ তাঁর কথায়, তুহিন বিশালগড় রবীন্দ্র নাথ কলেজের ছাত্র৷ তাছাড়া, কলকাতায় একটি বেসরকারী কলেজে বি.এড কোর্স করছেন৷ আগামী সপ্তাহ তুহিন কলকাতায় ফিরে যাবে বলে স্থির হয়েছিল৷ কিন্তু, তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল, আক্ষেপ করে বলেন মৃত যুবকের বড় ভাই৷

তিনি বলেন, গতকাল রাত ১টা নাগাদ তুহিনের মোবাইলে একটি ফোন আসে৷ তখন তারা হিন্দিতে কথা বলছিল৷ এরপরই তুহিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়৷ কিন্তু, দীর্ঘক্ষন হয়ে গেলেও বাড়ি ফিরে না আসায় আমরা তাকে খুজতে বের হই৷ তিনি বলেন, রাত ২টা থেকে তাকে খুজাখুজি শুরু হয়৷ অনেকক্ষণ খোজাখুজির পর পুটিয়া সীমান্তে ৬ নম্বর গেইট সংলগ্ণ কাটা তারের বেড়ার পাশে গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ দেখতে পাই আমরা৷ তিনি জানান, তুহিনের শরীরের উপরের অংশটি কাটা তারের বেড়ার ওপারে এবং বাকি অংশ বেড়ার এপাড়ে ছিল৷

অনিক মিয়ার অভিযোগ, তার ছোট ভাই তুহিনকে বিএসএফ মারধোর করে গুলি মেরে খুন করেছে৷ তাঁর দাবি, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে কিছুদিন বিএসএফ-রএর সাথে বচসা হয়েছিল৷ ওই সময় থেকে তার পরিবারের প্রতি বিএসএফ অসন্তোষ্ট৷

তবে, পাচারকারীদের আটকাতে গিয়ে ওই যুবক গুলিবিদ্ধ মারা গিয়েছেন বলে দাবি করেছে বিএসএফ৷ বিএসএফ-এর জনৈক আধিকারিক জানান, গতকাল রাতে পুটিয়া সীমান্ত দিয়ে প্রচুর গরু পাচার করা হচ্ছিল৷ পাচারকারীদের আটকাতে গেলে তারা বিএসএফ-এর উপর হামলা করেন৷ তখন বিএসএফ-এর সাথে পাচারকারীদের ধবস্তাধবস্তি হয়৷ তাতে, তিন জওয়ান আহত হয়েছেন৷ তিনি দাবি করেন, আত্মরক্ষার্থে এবং পাচারকারীদের আটকাতে বাধ্য হয়ে বিএসএফ-কে গুলি চালাতে হয়েছে৷ তাতে, ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে৷ তিনি আরো দাবি করেন, মৃত যুবক এলাকায় পাচারকারীদের লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত ছিল৷ তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার পাচারে মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে৷

এই ঘটনা সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক বিএসএফ আধিকারিক বলেন, সীমান্তে টহলদারী বিএসএফ জওয়ানরা নন ল্যাথেল বন্দুক ব্যবহার করেন৷ ওই বন্দুকের গুলিতে কারোর মৃত্যুর কোন সম্ভাবনা নেই৷ কেবলমাত্র দুসৃকতিকারীদের মোকাবিলা করার জন্য ওই বন্দুক সাথে রাখেন জওয়ানরা৷ কিন্তু, শরীরের বিশেষ কিছু অংশে ওই বন্দুকের গুলি লাগলে মৃত্যু হতে পারে৷

কলমচৌড়া থানার ওসি জানিয়েছেন, ওই যুবকের বুকে গুলি লেগেছে৷ বিএসএফ-এর বন্দুক থেকে ছুড়া গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে, নাকি অন্য কোন রহস্য রয়েছে, তা মৃতদেহ ময়না তদন্তের পর বোঝা সম্ভব হবে৷ এ-বিষয়ে গ্রামবাসীর অভিযোগ, গরু পাচারের লাইনম্যান হলেও, গতকাল তুহিন চক্রান্তের শিকার হয়েছেন৷ তাঁদের বক্তব্য, এলাকায় গরু পাচারের দুইটি গোষ্ঠি রয়েছে৷ হয়তো, গতকাল পাচারের খবর বিএসএফ-কে পাচারকারীদের তরফে জানানো হয়েছে৷ নয়তো, গরু পাচারকে ঘিরে দুই গোষ্টির মধ্যে সংঘর্ষে তুহিনের এই পরিণতি হয়েছে৷

গ্রামবাসীদের দাবি, গরু পাচার থামাতে বিএসএফ গুলি ছুড়েছে৷ কিন্তু, একটি গরু বিএসএফ ধরতে পারেনি৷ শুধু তাই নয়, বিএসএফ-এর দাবি মোতাবেক প্রচুর গরু পাচার হচ্ছিল এবং কয়েকজন পাচারকারী এই কাজে যুক্ত ছিল৷ তাহলে শুধু তুহিনের মৃত্যু হল গুলিবিদ্ধ হয়ে৷ অন্য কাউকেই বিএসএফ আটকও করতে পারেনি, গরুও ধরতে অক্ষম হয়েছে৷ তাতে, সন্দেহ আরো বাড়ছে বলে দাবি গ্রামবাসীর৷

পুলিশ এই ঘটনাকে ঘিরে এখনো কোন মন্তব্য করেনি৷ কলমচৌড়া থানার ওসি-র বক্তব্য, ওই ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে৷ তাতে, সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷ তাই তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা সম্ভব নয়৷ এদিকে, এই ঘটনাকে ঘিরে পুটিয়া গ্রামে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে রয়েছে৷ এলাকায় বিশাল বাহিনী মোতায়েন করার হয়েছে৷ আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও, গ্রামবাসীরা বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷