জ্বলছে অরুণাচল, বন্ধ ইন্টারনেট-বাজারহাট, আটক বহু পর্যটক

ইটানগর, ২৫ ফেব্রুয়ারি (হি. স.) : অরুণাচল প্রদেশের পরিস্থিতি আজও অপরিবৰ্তিত। অচল গোটা রাজ্য। আতঙ্কিত আম-নাগরিক, পর্যটককুল। অনিৰ্দিষ্টকালের জন্য রাজধানী ইটানগর এবং নাহরলগুনে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। কোনও বাধা-আশ্বাসে কাবু হচ্ছে না আন্দোলনকারীরা। চারদিন ধরে ইটানগর ও নাহরলগুনে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্ৰণের জন্য ইটানগরে টহল দিচ্ছে ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি)-এর ছয় কোম্পানির সঙ্গে আধা-সেনা বাহিনী। রাজ্যে শান্তি-সম্প্ৰীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্ৰী রাজনাথ সিং এবং রাজ্যের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু।


অরুণাচলে দীৰ্ঘদিনের বাসিন্দা ছয় জনগোষ্ঠীর মানুষ যথাক্রমে দেউরি, সনোয়াল কছারি, মরান, আদিবাসী এবং মিসিংদের স্থায়ী বাসিন্দার প্ৰমাণপত্ৰ (পার্মানেন্ট রেসিডেনশিয়াল সার্টিফিকেট, পিআরসি) দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে অরুণাচলে ছাত্র সমাজ ও একাংশ জনতা। উন্মত্ত প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে সরকারের সিদ্ধান্ত বদল করে এ রকম কোনও পিআরসি সম্পর্কিত প্রসঙ্গ বিধানসভায় উত্থাপন করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু। টুইটারেও তিনি লিখেছিলেন, চলতি বিধানসভা অধিবেশনে এ সংক্রান্ত বিল পেশ করা হবে না বলে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। অধিকন্তু গতকাল রাজ্য সরকারের তরফ থেকে পাহাড়ি রাজ্যে অ-অরুণাচলি কাউকেই স্থায়ী বাসিন্দার প্ৰমাণপত্ৰ পাবেন না বলে নতুন করে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। তবু শান্ত হচ্ছে না আন্দোলনকারীরা। এ প্রসঙ্গে তাদের পিছনে বিদেশি শক্তি ক্রিয়া করছে বলেও ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। কেননা, সরকারিভাবে বিজ্ঞপ্তি জারির পরও পিআরসি-র বিরোধিতা করে রাজ্যের ১৬টি ছাত্ৰ সংগঠন বনধ-এর সময়সীমা বাড়িয়ে ৭২ ঘণ্টা করা হয়েছে। বনধ-এর নামে ব্যাপক হিংস্রতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, অ-অরুণাচলিদের অধিকংশ রাজধানী ইটানগর ও নামসাইয়ের বাসিন্দা। জানা গেছে, রবিবার রাত থেকে বন্দুক হাতে নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিবাদীরা। তারা নাহরলগুন ও রাজধানীতে কয়কজন গৃহস্থের বাড়ি গিয়ে বন্দুক সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে বলে এক সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে হিন্দুস্থান সমাচার-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে এক বার্তালাপে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু বলেছেন, তদানীন্তন তাকাম সঞ্জয়ের কংগ্ৰেস সরকারই পিআরসি প্ৰবৰ্তন করেছিল। এই বিল বর্তমান সরকার আনেনি। রাজ্যের বর্তমান সরকার তা নিয়ে বিধানসভায় আলোচনা করতে পদক্ষেপ নিয়েছিল মাত্র। কিন্তু রাজ্যের জনতা না চাইলে এই বিল উত্থাপন করা হবে না। তা বিরুদ্ধাচরণকারীদের জানানো হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবেশ শান্ত হলে এ নিয়ে ভাবা হবে। মূলত আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে এক অরাজকতার সৃষ্টি করতে চাইছে বিরোধীরা। তবে তাদের পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হবে না, দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন মুখ্যমন্ত্রী খান্ডু।
বনধ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল শুক্রবার থেকে। এর পর দুদিন ব্যাপক হিংসার আশ্রয় নেয় প্রতিবাদকারীরা। শুক্রবার রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত যুবক রিসো তারির মৃতদেহ আইজি পাৰ্কে টেনিস কোৰ্ট চত্বরে বিজেপি-র নিৰ্মীয়মাণ নয়া দফতরে সমাহিত করতে গোঁ ধরেছে আন্দোলনকারীরা। এখানে একটি বিশাল গর্তও ইতমধ্যে তারা খোদাই করে ফেলেছে। গতকাল রবিবার সকাল প্রায় ১০-টা নাগাদ টেনিস কোৰ্ট থেকে মিছিল করে গিয়ে নিতিবিহারে উপ–মুখ্যমন্ত্ৰী চাওনা মেইনের ব্যক্তিগত চারতলের বাড়ি ঘেরাও করা হয়। এরই মধ্যে একাংশ উত্তেজিত জনতা উপ–মুখ্যমন্ত্ৰীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। তবে সে সময় তিনি বাড়ি ছিলেন না, ছিলেন নামসাইয়ে। এছাড়া উন্মত্ত প্ৰতিবাদকারীরা ইটানগরে জেলাশাসকের কাৰ্যালয়েরও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তাছাড়া পুলিশ থানার পাশপাশি অগ্নিনিৰ্বাপক বাহিনীর কাৰ্যালয়ে ভাঙচুর এবং কয়েকটি দমকলের ইঞ্জিন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।
এখানেই ক্ষান্ত না থেকে গতকাল এরা মুখ্যমন্ত্ৰী পেমা খান্ডুর সরকারি আবাস আক্ৰমণ করতে এগিয়ে যায়। মারমুখি জনতাকে প্রতিহত করতে পুলিশ ও সিআরপিএফ লাঠিচালনা করে। এতে কাজ না হওয়ায় প্রথমে কাঁদানে গ্যাস এবং পরে শূন্যে গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। এতে দুই প্ৰতিবাদকারীর মৃত্যুর পাশাপাশি অন্য আটজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতদের একজন বিকি রুজা (২০) দেরানাতুম কলেজের স্নাতক চতুৰ্থ ষাণ্মাষিকে ছাত্ৰ। অন্যজন তাওয়াঙের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সেরিং ওয়াগড়ে (৩৪)। এদিকে প্ৰতিবাদকারীদের পাথরবৰ্ষণে রাজধানী ইটানগরের পুলিশ সুপার এস হৰ্ষবৰ্ধন আহত হয়েছেন। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 
শুক্রবার ইন্দিরা গান্ধী পাৰ্কে অনুষ্ঠিত অরুণাচল ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মণ্ডপ, যানবাহন, মূল্যবান সামগ্রী জ্বালিয়ে দেওয়ার পর অবশিষ্ট যে-সব সামগ্রী রক্ষা পেয়েছিল সেগুলোও রবিবার রাতে পুড়িয়ে উল্লাস করেছে প্ৰতিবাদকারীরা। গত দুদিনে তাদের হাতে অগ্নিদগ্ধ হয়েছে দমকলের ইঞ্জিন, পুলিশের গাড়ি-সহ কমপক্ষে ১৫০টি যানবাহন।
এ ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা নাহরলগুনেও সংঘটিত হয়েছে। রাজ্যের বনমন্ত্ৰী নাবাম রেবিয়ার তিনতল বিশিষ্ট তাকর কমপ্লেক্স (শপিংমল)-সহ দুটি শপিংমল প্ৰতিবাদীরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। এরা বিভিন্ন স্থানে দোকানপাটে লুটপাটও চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শাসকদল বিজেপি-র প্রদেশ সভাপতি তাপির গাওয়ের হাতিমাখায় অবস্থিত বাণিজ্যিক বাড়ি, ৪০টি দোকান, দলের প্রদেশ উপ-সভাপতি পামে পাসাঙের ব্যবসায়িক প্ৰতিষ্ঠানে বিদ্যমান সোহাম শপিং মল, নাহরলগুন থানায় হামলা, বিধায়ক তেসি কেশরের সি সেক্টরের বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে অ্যাডিডাস-এর বিপণিতে লুটপাটের মতো অজস্ৰ ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। ভাঙচুর হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কাউন্টারও।
অন্যদিকে খবর সংগ্রহকারী সংবাদকৰ্মীদেরও আন্দোলনকারীদের হাতে নিগৃহীত হতে হয়েছে। চিত্রসাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে ভাঙচুর করছে উন্মত্তরা। অসম তথা দেশের বিভিন্ন প্ৰান্ত থেকে আগত বহু শিক্ষার্থী, সংবাদকর্মী, ব্যবসায়ী, পর্যটক ইটানগর নাহরলগুন ইত্যাদি এলাকায় আটকে পড়েছেন। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। ইটানগর ও নাহরলগুনে এ মুহূর্তে বাজারহাট, দোকানপাট, পেট্ৰোল পাম্প এটিএম, ইন্টানেট পরিষেবা বন্ধ। 
ছাত্ৰ-জনতা আন্দোলন লাগামছাড়া হিংসাত্মক রূপ ধারণ করায় মুখ্যমন্ত্ৰীর আবাস, সচিবালয়, মন্ত্ৰী ও বিধায়ক আবাসে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর সরকারি বাসভবন ছেড়ে রাতে রাজভবনে আশ্ৰয় নিতে হয়েছে বলে এক খবরে প্রকাশ।
জানা গেছে, উন্মত্ত জনতার হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকারি বাসভবন ছেড়ে মুখ্যমন্ত্ৰী রাজভবনে আশ্ৰয় নেওয়ার পর রবিবার সন্ধ্যায় দিল্লি থেকে তড়িঘড়ি বায়ুসেনার হেলিকপ্টারে এসেছেন রাজ্যপাল ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) বিডি মিশ্ৰ। রাজভবনে এসেই তিনি এক সৰ্বদলীয় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে তিনি রাজ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর পর্যালোচনা করেছেন। 
এদিকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতার দায়ে রাজ্যে রাষ্ট্ৰপতি শাসন প্ৰবৰ্তনের দাবি তুলেছে কংগ্ৰেস। আজ রাজভবনে গিয়ে কংগ্রেসের এক প্রতিনিধি দল রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে এই দাবি তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *