ধর্ণায় মমতা, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তীব্র

কলকাতা, ৩ ফেব্রুয়ারী৷৷ সিবিআই অভিযানকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্র-রাজ্য নজীরবিহীন সংঘাতে গুরুতর সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷ গণতান্ত্রিক ভারতের ইতিহাসে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজ্য পুলিশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জি মেট্রো চ্যানেলের সামনে দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় ও কেন্দ্রের জরুরী অবস্থার মতো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ধর্ণায় বসেছেন৷ এই ঘটনা ঘিরে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কতখানি ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নিতে পারে তাও আজ বিশেভাবে লক্ষ্যনীয়৷ আজ গভীর রাত পর্যন্ত নিজাম প্যালেসে সিবিআই আধিকারীকরা বৈঠক করেছেন৷ কাল এই ঘটনার বিহিদ চেয়ে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবে বলে জানানো হয়েছে৷

রবিবার কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাংলোয় সিবিআই হানা ঘিরে কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংঘাত চরমে উঠে৷ এই ঘটনায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক অভ্যুত্থানের অভিযোগ তুলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জি৷ প্রতিবাদে তিনি মেট্রো চ্যানেলে ধর্ণায় বসেছেন৷ এদিকে, এদিন সন্ধ্যায় সিবিআই আধিকারীকদের জোর করে আটক করার অভিযোগ উঠেছে কলকাতা পুলিশের বিরুদ্ধে৷ তাঁদের আটক করার সময় সিবিআই আধিকারীক এবং কলকাতা পুলিশের ধবস্তাধবস্তি হয়েছে৷ পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠে যে, নিজাম প্যালেস এবং সিজিও কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়৷ সিবিআই’র দাবি, কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার চিটফান্ড মামলায় বহু তথ্য প্রমাণ নষ্ট করেছেন৷ তাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আইন মেনে তাঁর বাংলোয় গিয়েছিলেন সিবিআই আধিকারীকরা৷ কিন্তু, কলকাতা পুলিশ অন্যায়ভাবে সিবিআই আধিকারীকদের আটক করেছে৷ পাল্টা অভিযোগ তুলেছে কলকাতা পুলিশও৷ কলকাতা পুলিশের দাবি, ওই আধিকারীকদের কাছে সিবিআই’র কোন প্রমাণ পত্র ছিল না৷ এমনকি কি উদ্দেশ্যে তাঁরা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাংলোতে গিয়েছিলেন তার কোন তথ্য প্রমাণ দিতে পারেননি৷ শুধু মাত্র তাঁদের উদ্দেশ্য জানার জন্যই সিবিআই আধিকারীকদের আটক করে থানায় গিয়ে যাওয়া হয়৷ এদিকে, কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের অভিযোগ, সিবিআই আধিকারীকরা বিনা নোটিশে তাঁকে হয়রানি করছে৷ আজ তাঁরা জোর করে বাংলোতে ঢুকার চেষ্টা করেছেন৷ ফলে, কে সত্যি বলছে, তা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বেড়েই চলেছে৷ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি, সোনিয়া গান্ধি, চন্দ্রবাবু নায়ডু, এইচ ডি দেবেগৌড়া, কংগ্রেস নেতা আহমেদ প্যাটেল, সমাজবাদী পাটি সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ফারুক আব্দুল্লা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং আরজেডি নেতা তেজস্বি যাদব৷ তাঁরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ তুলেছেন৷ রাহুল গান্ধি ট্যুইটারে বলেছেন, বিরোধীরা একত্রিত হয়ে ফ্যাসিস্টসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে৷

এই ঘটনা নিয়েই সরব হলেন তৃণমূলের মুখপাত্র ডেরেক ও’ব্রায়েন৷ ট্যুইটে তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ‘সাংবিধানিক আক্রমণ’ শানাচ্ছে বিজেপি৷ পরিকল্পনা করে এই সাংবিধানিক আক্রমণ করছে বলে ট্যুইট বার্তায় দাবি করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র ডেরেক ও’ব্রায়েন৷ শুধু তাই নয়, সোমবার পার্লামেন্টে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদরা মোদী হঠানোর দাবি তুলবে৷ এবং অন্যান্য অ-বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলির কাছে আবেদন জানাবে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার৷ এমনই লিখেছেন ডেরেক৷

ডেরেকের এই ট্যুইটেরই পাল্টা দিয়েছেন বিজেপির লকেট চ্যাটার্জী৷ পাল্টা ট্যুইটে তিনি লিখেছেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক৷ এত ভীত দেখাচ্ছে কেন? সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্তরা জেলে যাবে কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে’৷ এর ঠিক আগেই আরও একটি ট্যুইট করে তিনি বলেন, ‘ পশ্চিমবঙ্গে সাংবিধানিক সঙ্কট চলছে৷ একমাত্র ভগবানই বাঁচাতে পারে৷’

এদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, সিবিআই আধিকারীকরা বাংলায় ক্যু করার চেষ্টা করছে৷ তাঁর অভিযোগ, ওঁরা সমস্ত সৌজন্য নষ্ট করে দিয়েছে৷ মমতা সাফ বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রী মোদির হুমকির পরেই আজ সিবিআই হানা দেওয়া শুরু করেছে৷ কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে জরুরি অবস্থার চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে৷ তাঁর আরও অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের সাথে লড়াই করতে পারছে না বিজেপি৷ তাই এখন সিবিআইকে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অজিত ডোভাল সিবিআইকে ব্যবহার করে এসব অনৈতিক কাজ করছে৷

মমতার কথায়, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে তছনছ করে দিচ্ছে মোদি-অমিত শাহ জুটি৷ তাঁরাই দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছে৷ তাঁর দাবি, রাজ্যের সহ দেশের সমস্ত পুলিশ ফোর্সকে সম্মান করি৷ কিন্তু, আজকের ঘটনায় আমি মর্মাহত৷ তাই তিনি দেশের পুলিশ ফোর্সকে আজকের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছেন৷

এদিন সন্ধ্যায় কলকাতার নগরপালের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী৷ সঙ্গে ছিলেন কলকাতার মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিম৷ ধরনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর পাশেই রয়েছেন তিনি৷ রয়েছেন রাজ্যের আরও দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন৷ যোগ দিয়েছেন মন্ত্রী ব্রাত্য বসুও৷ আসছেন তৃণমূলের অন্যন্য শীর্ষ নেতৃত্ব৷ মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টাও হাজির হয়েছেন সেখানে৷ বাধা হচ্ছে মঞ্চ৷

সোমবার বিধানসভায় পেশ করা হবে রাজ্য বাজেট৷ তার আগে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ রয়ে গিয়েছে৷ তা সম্পন্ন করতেই মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না মঞ্চের পাশে একটি বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে৷ সেখানেই বাজেট সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ফেলা হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী৷

সিবিআই অবশ্য তাঁরা কোন অনৈতিক কাজ করেনি বলে দাবি করেছেন৷ বরং অভিযোগ করেছে, কলকাতা পুলিশ তাঁদের কাজে বাধা দিয়েছেন৷ সিবিআই ডেপুটি ডিরেক্টর পঙ্কজ শ্রীবাস্তবের কথায়, কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে চিটফান্ড মামলায় তথ্য প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে৷ তাঁর দাবি, রাজীব কুমার বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছেন৷ আজ আইন মেনেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিলেন সিবিআই’র আধিকারীকরা৷ কিন্তু, কলকাতা তাতে বাধা দিয়েছে৷ সূত্রের ঘটনায়, আজকের ঘটনায় সিবিআই আগামীকাল সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্ত হবে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *