নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সমর্থনে সওয়াল মোদির, রাজ্যসভায় দেখে নেওয়ার হুমকি মমতার

ঠাকুরনগর ও দুর্গাপুর, ২ ফেব্রুয়ারি (হি.স.) : এবার কোনও সিন্ডিকেট ট্যাক্স নয় সোজা কৃষকদের অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাবে। শনিবার উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের সভা থেকে তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে তোপ দেগে এমনটাই বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সমাবেশে নাগরিকত্ব বিলের কথাও উল্লেখ করেন মোদী। এদিন প্রধামন্ত্রীর জনসভা শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক মানু্যের সমাগম দেখে আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী। দুর্গাপুরের অপর একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ জারি রেখে বলেন, কলেজে ভর্তি থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে সবেতেই এরাজ্যে ‘ট্রিপিল টি’ মানে তৃণমূল তোলাবাজি ট্যাক্স লাগে। স্বার্থের জন্য আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প আটকে গরীব মানুষকে ধোকা দিয়েছে যে সরকার। এরকম নিষ্ঠুর সরকার এক পলকও থাকা উচিত নয়। আমি আত্মবিশ্বাসী, আপনারা এই অবস্থা বেশীদিন বরদাস্ত করবেন না। বাংলা পরিবর্তন করবেই। দমবন্ধ মানুষ মমতা সরকারকে হাটাবে।’ প্রধানমন্ত্রী আক্রমণাত্মক আচরণে ক্ষুদ্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “বিজেপির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ| ওদের এক্সপায়ারি ডেট হয়েগেছে| আগে দিল্লির সরকার যাবে| আর আমাদের সরকার থাকবে কিনা টা বাংলার মানুষ ঠিক করবে| আমাদের তাড়ানোর উনি কে”| অন্যদিকে রাজ্যের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্তব্যের বিরোধিতায় না গিয়েও সমর্থন করল না কংগ্রেস| কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে আঁতাতের অভিযোগও তুলেছে কংগ্রেস| শনিবার কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য ‘হিন্দুস্থান সমাচার’-কে বলেন, “এ রাজ্যে মানুষকে যে তোলা দিতে হচ্ছে, এ কথা অস্বীকার করব না। সাধারণ মানুষকে নানাভাবে এর মাশুল দিতে হচ্ছে। তবে, প্রধানমন্ত্রীকে বলব, নিজের চরকায় তেল দিন। উনি যে বিভিন্ন রকমের কর চাপিয়েছেন, সেগুলি আগে প্রত্যাহার করুন। নিজেরা নির্মল ভারত গড়ার যে ডাক দিয়েছেন, তা নিছকই কথার কথা।\” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিযোগকে মান্যতা দিতে রাজি নয় সিপিএম| শনিবার রায়গঞ্জের সাংসদ তথা সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রে মোদী এবং রাজ্যে মমতা দুজনেই লুটের রাজনীতি করছেন। তাঁদের বক্তব্যে যে তথ্য উঠে আসছে, তা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে কতটা মিথ্যা লুকিয়ে রয়েছে তাতে৷

এদিন ঠাকুরনগরের প্রথম সভায় মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সিন্ডিকেট ট্যাক্স লাগবে না। আজকের সভায় এত মানুষের উপস্থিতি দেখেই স্পষ্ট কত মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি। এই কারণেই দিদি ভয় পাচ্ছেন”। তিনি আরও বলেন, “যাঁরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নিরীহ মানুষকে তাঁরা খুন করে দেন। সেটাই হয়ে চলেছে। এ সব বন্ধ হবে”।

এদিন প্রধানমন্ত্রী ওই সভা থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন । তিনি বলেন, দেশ ভাগের পর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বহু হিন্দু, পার্সি, শিখ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের মানুষজন অন্য দেশ থেকে এদেশে চলে এসেছিল । কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখনও ভারতীয় নাগরিকতা পাননি, তাই তাঁদের এদেশে পাকাপাকি বসবাস করার ব্যাবস্থা করবে মোদী সরকার। আর সেই জন্য নাগরিকত্ত্ব সংশোধনী বিল লাগু হবে।

একই সঙ্গে তিনি শুক্রবারের কেন্দ্রের অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে প্রসঙ্গে বলেন, এই বাজেট ছিল একটা সূচনা মাত্র। লোকসভা ভোটের পরে পূর্ণাঙ্গ বাজেট এলে কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্তদের কাছে পুরো ছবিটা স্পষ্ট হবে। তাদের জন্য কোনও সরকার এত ভাবেনি। শনিবার ঠাকুরনগরের মতুয়া সম্মেলনে এই দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, কংগ্রেস কর্ণাটকে কৃষকদের পেছনে পুলিশ লাগিয়েছে। আর তৃণমূল তাদের সমর্থন করেছে। আজ আমি ভিড় দেখে বুঝেছি, দিদি কেন প্রতিনিয়ত আমদের কর্মীদের আক্রমণ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠাকুরনগরের মাটি পবিত্র মাটি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন বাংলার মাটি মনীষীদের স্নেহ ধন্য।

ঠাকুরনগরে জনসভায় যোগ দিতে এদিন সকালেই কলকাতায় এসে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বায়ুসেনার বিশেষ হেলিকপ্টারে চেপে তিনি ঠাকুরনগরে পৌঁছন। এটি মূলত মাতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত এলাকা। এদিন সভাস্থলে চারপাশে বহু মানুষের সমাগম হয়। রাস্তায় ও আশেপাশের বাড়ির ছাদেও প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য বহু লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিরাপত্তার জন্য এসপিজি এবং জেলা পুলিশ জওয়ানরা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করেন। এদিন বেলা ১১ টা ৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী দমদম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে থেকে বিশেষ হেলিকপ্টারে করে ঠাকুরনগরের পৌছন । ঠাকুরনগরে পৌঁছনোর পরে মতুয়া মহাসঙ্ঘের বড়মা বীণাপানি দেবীর সঙ্গে দেখা করেন । তারপরে মতুয়া সম্প্রদায়ের নাট্য মন্দিরে পূজা দেন। এরপর সভাস্থলের গিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি। প্রায় ১৮ মিনিট বক্তব্য রাখার পর সভাস্থলে বিশৃঙ্খলার কারণে মঞ্চ থেকে তিনি নেমে যান। বিজেপি সূত্রের খবর, ঠাকুরনগরের সভা শেষে দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।

প্রায় চার দশক পর দেশের প্রধানমন্ত্রী পা রাখলেন দুর্গাপুরে । শনিবার উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের সভা শেষ করে পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের সভাস্থলে পৌঁছন প্রধানমরন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে তাঁকে শঙ্খ ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানান দলীয় কর্মীরা । এদিন দুর্গাপুরের নেহেরু স্টেডিয়ামে বিজেপির সভায় নিজের ভাষণ শুরু করেন বাংলায় | স্টেডিয়ামের জনজোয়ার দেখে তিনি বলেন, আমি ভাগ্যবান | যে স্থানের নামের শুরুই হচ্ছে দুর্গা দিয়ে সেখানকার এই জনজোয়ার আমার কাছে আশির্বাদ | এরপরই সরাসরি তিনি আক্রমণ হানেন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে | এদিন রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে তুলোধনা করে বলেন,\” বাংলায় উন্নয়নে বেশী জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরাজ্যের সরকার সেই উন্নয়নকে লাগু করতে চায় না। এখানে ৯০ হাজার কোটি টাকার ২ ডজন প্রকল্প চালু করতে দেয় নি, না হয় ধীর গতিতে চলছে। কোন সহযোগিতা করে না। তৃণমূল সরকার সেখানে হাত দেয় না, যেখানে সিন্ডিকেটের শেয়ার নেই, মালাই নেই। আর তাই বাংলায় যতদিন উন্নয়ন বিরোধী সরকার থাকবে, ততদিন উন্নয়ন হবে না।\” এখানে পড়াশোনাতেও ‘ট্রিপিল টি’ তৃণমূল তোলবাজি ট্যাক্স লাগে। আর ওই ট্যাক্স না দেওয়ায় স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ আদালতে চক্কর কাটছে।\”

সেইসঙ্গে এদিন তিনি বিগ্রেডে জোটের সভাকে কটাক্ষ করে বলেন, \” কলকাতায় চৌকিদারকে হাটানোর শপথ নিচ্ছে, কারন দুর্নীতি আর কালো টাকার বিরুদ্ধে বড় অভিযান শুরু হয়েছে। যোজনার টাকা খাওয়ার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। সব থেকে শক্তিশালি নাম ডাক পরিবারও আদালতে ছুটছে। নির্মান সংস্থায় বড় দালালি, কাচা-পাকা বিল বন্ধ করে দিয়েছে এই চা বিক্রেতা। নতুন আইন তৈরী করেছে এই চৌকিদার। তাই কলকাতায় গলা মেলাচ্ছে। কারও ভাই, কারও ভাইপো, কেউ নিজেই অপরাধী। যারা চার বছর আগে একে অপরের মুখ দেখত না। তারাই গলা মেলাচ্ছে।\”

এদিন তিনি এও বলেন, গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকা কালিন ইউপিএ সিবিআই তদন্ত করে ছিল উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে। আমি আটকাইনি। কারন আমি সৎ। আর দিদি তদন্তকারী সংস্থাকেও ঢুকতে দেয় না। মমতাদি এত ভয় কেন? বিজেপির সভাপতি আসলেও দিদির মাটিতে পা পিছলে যায়। কারন মমতাদি সবই জানে। সারদা, নারদা, চিটফান্ড সব তার এক দরজায় যাচ্ছে। দিদি আপনার এই খেলা বেশীদিন চলবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জারি থাকবে। জগাই, মাধাই, সিন্ডিকেটরাজ মুক্ত বাংলা হবে।\”

পাশাপাশি এদিন দুর্গাপুরের সভা বিগত ইউপিএ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন,\” আগের সরকার ১০ বছর অন্তর ৫২ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ মুকুব করত। গরীব কৃষকরা ১০-১৫ টাকার বেশী সুবিধা পেত না। ঋণমুকুবের সুবিধা পেত যারা কৃষকই নয়। আমরা স্বাধীনভারতে পিএম কৃষক নিধি যোজনায় দেশের ১২ কোটি কৃষক প্রতিবছর ৬ হাজার টাকা করে পাবে। ৭ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রতি বছর কৃষকরা আজীবিন সুবিধা পাবে।\” এদিনের সভায় বাজেটের প্রশাংসা করে বলেন, এবারের বাজেট সব কা সাথ, সব বিকাশের বাজেট। এটা তো ট্রেলার। নির্বাচনের পর নতুন বাজেটে, নতুন ছবি আপনাদের সামনে তুলে ধরব।\”

এদিকে, আজ দুর্গাপুরের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঠাকুরনগরের সভায় হওয়া বিশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেন | প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, মাঠের থেকে দ্বিগুণ চলে এসেছিল। ফলে সমস্যা হয়েছিল সেখানকার মানুষের। আর সেজন্যে ক্ষমাও চেয়ে নেন তিনি ।

এর পাল্টা জবাব দিয়ে মমতা বলেছেন, “বিজেপির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ| ওদের এক্সপায়ারি ডেট হয়েগেছে| আগে দিল্লির সরকার যাবে| আর আমাদের সরকার থাকবে কিনা টা বাংলার মানুষ ঠিক করবে| আমাদের তাড়ানোর উনি কে”| একই সাথে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, “গো রক্ষকের নাম দাঙ্গা করছে মোদীর সরকার| এদের কোনও রাজনৈতিক সত্ত্বা নেই| যাদের সারা দেহে দাঙ্গার রক্ত তাঁদের কাছ থেকে দাঙ্গার প্রশ্ন আসবে সেটাই তো স্বাভাবিক| ওরা আমাদের টুকলি করেছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প আমরাই প্রথম চালু করি। আয়ুষ্মান প্রকল্পেরও আগে। আমাদের কন্যাশ্রী দেখেও টুকলি করছেন তিনি| এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেট নিয়ে বসে আছেন মোদী| দুর্নীতির ঠাকুরদাদা মোদী| নিজস্ব বিমান, নিজস্ব স্টাইল নিয়েই ব্যস্ত| ওঁরাই হাজার হাজার টাকা লুঠ করেছেন| চালুনি আবার সুচের বিচার করছে| একটা পয়সাও বাংলাকে দেয়না| আবার বড় বড় কথা বলে| মোদীর সরকার দানবীয় সরকার, গোগ্রাসে মানুষ গিলছে”|

এই সভাতেই বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান নাগরিকত্ব বিলকে সমর্থন করার৷ যদিও তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টই জানিয়েছেন, কেন্দ্রকে এই বিল প্রত্যাহার করতেই হবে৷ তাঁর কথায়, ‘‘ভারতবর্ষ এক থাকবে, উনি বিদায় নেবেন৷ মানুষে মানুষে যুদ্ধ লাগাতে দেব না৷ দেশ বিভাজনের রাজনীতি হতে দেবনা| দেশটাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে মোদী’’

নাগরিকত্ব বিল পাশের ব্যাপারে সংসদে তৃণমূলের সমর্থন পাবে না বিজেপি সরকার বলেও হুঁশিয়ারী দেন মমতা বন্দোপাধ্যায়৷ প্রতিবেশী মুসলিম প্রধান দেশগুলি থেকে অ-মুসলিম নাগরিকদের সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য বিলটি আনা হয়েছে৷ এটিই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নামে পরিচিত৷ অভিযোগ, ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের সংবিধানকে শিকেয় তুলে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক করার জন্য চেষ্টা করছে বিজেপি তথা এনডিএ সরকার৷ পাশাপাশি তিনি বলেন, “বিহারী, মুসলমান ভাইদের খেদাও করতে চাইছে মোদীর সরকার| যা আমরা হতে দেবনা”|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *