নোট বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বড় ধাক্কা খাইল বিরোধী জোট৷ বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই মঙ্গলবার দিল্লীতে কংগ্রেস বিরোধী দলগুলির যে বৈঠক ডাকিয়াছে সেখানে সিপিআই(এম) দল যোগ দিবে না৷ দলের বক্তব্য কোনও একটি দল নিজেদের ইচ্ছামতো দিনক্ষণ স্থির করিয়া বৈঠক ডাকিলেই সব বিরোধীরা তাহাতে যোগ দিবেন এবং বিরোধী ঐক্য তৈরী হইয়া যাইবে এমন কখনও ঘটে না৷ রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ ঘটিতে চলিয়াছে৷ কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী তৃণমূল সুপ্রীমো তথা পশ্চিবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে বৈঠক করিবার কথা৷ সেই মতো সোমবারই মমতা দিল্লী পাড়ি দিয়াছেন৷ পশ্চিমবঙ্গে গত বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত করিয়া ভরাডুবি হইয়াছে৷ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস নিশ্চিহ্ণের পথে৷ সিপিএম দলও এখন একেবারেই নিস্তেজ অবস্থায়৷ রাজনীতির ভুলের খেসারত কংগ্রেস ও সিপিএম উভয় দলকেই দিতে হইতেছে৷ সোনিয়া গান্ধী রাজনীতির অংকে ইহা বুঝিতে পারিতেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মোদি বিরোধী আন্দোলন তেজী করা যাইতে পারে৷ ত্রিপুরা ও কেরালা ছাড়া অস্তিত্বহীন অবস্থায় সিপিএম৷ সংসদে এই দলের শক্তি নাই৷ সেই তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস অনেক বেশী রাজনৈতিক শক্তির অধিকারী৷
কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার মাখামাখির বিষয়টাকে ভাল চোখে নিতে চাহিবে না সিপিএম৷ তাহাদের চোখে বড় ভিলেন মমতা৷ পশ্চিমবঙ্গের এত বড় সাম্রাজ্য তছনছ হইয়াছে মমতার কারণেই৷ এখনও বঙ্গে সিপিএম মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারিতেছে না৷ দিদি ভক্তদের সমিহ করিয়া চলিতে হয়৷ নোট বাতিল ইস্যুতে পঃবঙ্গে সিপিএমের ডাকা বন্ধ প্রত্যাখাত হইয়াছে৷ আসলে, রাজনীতির সাধারণ জ্ঞানেরও যেন অভাব হইয়াছে বঙ্গ সিপিএমের৷ বর্ষিয়ান নেতা বিমান বসুকে বলিতে হইয়াছে বন্ধ ডাকাটা ভুল হইয়াছে৷ এই ভাবে একের পর এক ভুল করিতেই যেন উৎসাহী সপিএম৷ রাজনীতির ইতিহাস তো তাহাই বলিতেছে৷ পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বাম শাসনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাফল্যই বেশী৷ শিল্প বিদায় নিয়াছে, বেকারত্ব বাড়িয়াছে, দলের একশ্রেণীর মাতববরদের উৎপাত ও অত্যাচার মানুষকে ক্ষুব্ধ করিয়া তুলিয়াছিল৷ দলের নেতাদের মধ্যে অবক্ষয় বাড়িয়াছিল৷ সংগ্রামী চেতনা হইয়াছিল উধাও৷ বিত্ত বৈভব আরাম আয়েসের মধ্যে দলের নেতা কর্মী, ক্যাডারদের, ভোগ সর্বস্বতার দিকেই ঠেলিয়া দিয়াছিল৷ সুযোগ পাইয়াই তৃণমূল কংগ্রেসকে উজার করিয়া ভোট দিয়াছে বঙ্গের ভোটাররা৷ সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের আন্দোলন ভাঙ্গিতে পুলিশী শক্তির ব্যবহার তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পথকে ত্বরান্বিত করিয়াছিল৷ কৃষকদের জমি কাড়িয়া নেওয়ার ঘটনা একটি ‘বিপ্লবী’ দলকে কলংকিত করিয়াছে৷ তৃণমূল কংগ্রেসকে এই সিপিএম সরকারই শক্তি যুগাইয়া দিয়াছে৷ এই ইতিহাস তো ভুলিবার নহে৷ পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এমন যে, সিপিএম সহসা ঘুরিয়া দাঁড়াইবে মনে করিবার কোনও কারণ নাই৷ জাতীয় রাজনীতিতে সেই দলই বেশী মাটি পায় যে দলের রাজনৈতিক শক্তি বেশী৷ বর্তমানে সিপিএম দল তো ক্ষীণবলের অধিকারী৷ সেখানে তৃণমূল অনেক শক্তি রাখে৷ রাজনীতির হিসাবে সোনিয়া মমতাকে নিয়া আলাদা ভাবে বৈঠক করিতে চাহিবেন খুব স্বাভাবিক কারণে৷ নোট বাতিল ইস্যুতে বিরোধীরা আন্দোলন মুখী হইতে তো অনেকটা বাধ্য৷ যদি ‘মোদিকে’ সব ছাড়িয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে দেখা যাইবে বিরোধী দলের অস্তিত্বই প্রশ্ণের মুখে দাঁড়াইয়া গিয়াছে৷ বেশ কিছুদিন আগে মমতা ব্যানার্জীকে ফোন করিয়া আহত সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জীর বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়াছেন৷ তখনই বরফ গলার শুরু৷ এইভাবেই আজ সোনিয়ার ডাকেও মমতা সাড়া দিয়াছেন৷ সিপিএম তাহাকে ভালভাবে নিতে পারিবে না৷ ইহাতে তাহাদের গুরুত্ব কমিবে৷ কংগ্রেস-তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ হইলে সিপিএম দলের ‘বিপদ’ আরও বাড়িবে৷ রাজনীতির এই হিসাবকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না৷
নোট বাতিল ইস্যুতে বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরায় জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির পক্ষে কিছুটা সহায়ক হইতে পারে৷ বিরোধী দলের আন্দোলনে তো বহুজন সমাজবাদী পার্টি ও সমাজবাদী পার্টি যুক্ত হয় নাই৷ যুক্ত হয় নাই নীতিশের দল৷ সুতরাং সম্মিলিত বিরোধী জোট গড়িয়া উঠে নাই৷ এক্ষেত্রে নানা বাধ্যবাধকতাও কাজ করিতেছে৷ সমাজবাদী গোষ্ঠী কোন্দলে বিধবস্ত৷ বিএসপি’র মায়াবতীও নোট কেলেংকারী বা কালো টাকার ফাঁদে আটকা পড়িতে পারেন৷ সব মিলিয়া ইহাই বাস্তব যে, সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য গড়িয়া উঠিবে না৷ এমন লক্ষণও নাই৷ বরং বিরোধী দলের মধ্যে অনৈক্যই প্রকট হইতেছে৷ সোনিয়া ও মমতা কি পারিবেন দেশময় মোদি বিরোধী জোর আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে? যদি তাহাতে ব্যর্থ হন তাহা হইলে মোদির বিজয় রথ বোধ হয় আটকানো যাইবে না৷
2016-12-28