বিরোধীদের চাপে চিটফান্ডের ব্যবসাই করতে না দেয়ার বিল আনবে রাজ্য, দ্বিতীয় সংশোধনী প্রত্যাহার

TLAনিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৯ ডিসেম্বর৷৷ বিরোধীদের যুক্তি ও তর্কের কাছে পিছুতে হয়েছে রাজ্য সরকারকে৷ আমানতকারী সুরক্ষা বিল দ্বিতীয় সংশোধনী সোমবার বিধানসভায় ধবনি ভোটে পাশ হলেও, কংগ্রেস বিধায়ক রতন লাল নাথ এবং তৃণমূল বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মনের যুক্তি ও তর্কের কারণে রাজ্য সরকার মেনে নিয়েছে বিলটি ত্রুটিপূর্ণ, তাই সংশোধনী প্রত্যাহার করা হউক৷ এদিন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের হস্তক্ষেপেই আমানতকারী সুরক্ষা বিল দ্বিতীয় সংশোধনী প্রত্যাহার করা হয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব, অর্থমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী মিলিতভাবে যুক্তি পরামর্শ করে আগামী বিধানসভা অধিবেশনে বিলটির সংশোধনী আনা হউক, যেখানে রাজ্যে আর কোন চিটফান্ড সংস্থাকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না তেমন আইন থাকবে৷ এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে রতন লাল নাথ এবং সুদীপ রায় বর্মন প্রস্তাব দেন, রাজ্যে লটারি যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেভাবে চিটফান্ডকেও নিষিদ্ধ করা হউক৷ তাঁদের বক্তব্য, এধরনের আইন প্রণয়নের সম্পূর্ণ এক্তিয়ার রাজ্য সরকারের আছে৷
সোমবার রাজ্য বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনের অন্তিম দিনে অর্থমন্ত্রী ভানুলাল সাহা আমানতকারী সুরক্ষা বিল দ্বিতীয় সংশোধনী সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করেন৷ ধবনিভোটে এই বিল পাশও হয়ে যায়৷ এই বিলের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে কেউ চিটফান্ডের ব্যবসা করতে আসলে বাধা দেওয়া যায়৷ তাই চিটফান্ড সংস্থাগুলি ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নিয়ম আরো কঠোর করেই বিলটির দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, রাজ্যে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে জেলাশাসকদের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে৷ মূলত, যে কোনও প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক কাজকর্ম শুরু করার আগে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়৷ শহরে পুর কিংবা নগর সংস্থা ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে থাকে৷ আমানতকারী স্বার্থ সুরক্ষা দ্বিতীয় সংশোধনী অনুসারে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে জেলা শাসকের কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷ এই সার্টিফিকেট ছাড়া মিলবে না ট্রেড লাইসেন্স৷ অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, জরিমানা সংক্রান্ত বিষয়েও সংশোধনী আনা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, জেলা শাসকের কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে যদি কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে প্রতিটি মিথ্যা তথ্যের জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে৷ অর্থমন্ত্রী দাবি, চিটফান্ড সংস্থা এখন থেকে রাজ্যে সহজে ব্যবসা করতে পারবে না৷
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এই দাবির সাথে সহমত পোষণ না করে কটাক্ষের সুরে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন বলেন, কেউ ব্যবসা করতে আসলে বাধা দিতে পারি না, তার বদলে আমরা চিটফান্ড সংস্থাগুলিকে আর ব্যবসাই করতে দেব না এমন চিন্তাধারা হওয়া উচিৎ সরকারের৷ তাঁর কথায়, আমরা আবার কেন চিটফান্ড সংস্থাগুলিকে আমন্ত্রণ জানাবো৷ সুদীপবাবু মনে করেন, এই বিল নতুন করে চিটফান্ড সংস্থাগুলিকে রাজ্যে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেবে৷ এছাড়াও এই বিলে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে, সেই কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজ্যের নিজস্ব উচ্চ আদালত রয়েছে৷ অথচ চিটফান্ড সম্পর্কিত কোন মামলা পূর্বের ন্যায় গুয়াহাটি হাইকোর্টের এক্তিয়ারভুক্ত রাখা হয়েছে৷ বিষয়টি আইনদপ্তরের কি করে এড়িয়ে গেল, সেই প্রশ্ণ তুলেন তিনি৷ তাঁর সাফ কথা, আগে যখন চিটফান্ড সংস্থাগুলি রাজ্যে ব্যবসা করতে এসেছে তখন সেবি কিংবা আরবিআই’র অনুমোদন রয়েছে কিনা সেবিষয়ে খতিয়ে দেখা হয়নি৷ এমনকি, জেলা শাসক কিংবা মহকুমা শাসকদের চিটফান্ড সংস্থাগুলির উপর নজর রাখার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত সরকার সঠিকভাবে বলতে পারছে না কি পরিমান আমানত লুঠ করে চিটফান্ড সংস্থাগুলি পালিয়ে গেছে৷ শুধু তাই নয়, যখন মহকুমা শাসকদের দিয়ে বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থাগুলির দপ্তরে হানা দেওয়া হয়েছিল, তারপরও তাদের একাউন্ট ফ্রিজ করা হয়নি, কোন কাগজপত্রও বাজেয়াপ্ত করা হয়নি৷ তাই নতুন করে সংশোধনী এনে তাদের রাজ্যে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়ার বদলে কোন চিটফান্ড সংস্থাকে ব্যবসাই করতে দেওয়া হবে না এমন বিল আনতে হবে, প্রস্তাব দেন সুদীপবাবু৷
কংগ্রেস বিধায়ক রতন লাল নাথও এদিন কটাক্ষের সুরে বলেন, বিলটি দেখে মনে হচ্ছে কাউকে আনার পরিকল্পনা চলছে৷ তাঁর সাফ কথা, বিলে যারা আমানত লুঠ করে পালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কোন কিছু বলা হয়নি৷ তিনি দাবি করে বলেন, বিলে প্রচুর ফাঁক রয়েছে৷ আর যেহেতু সিলেক্ট কমিটিতে পাঠিয়ে কোন লাভ হবে না৷ তাই বিলটি প্রত্যাহার করা হউক৷ কোন চিটফান্ড সংস্থাকে রাজ্যে আর ব্যবসাই করতে দেওয়া হবে না, এমন বিল আনা হউক বলে তিনিও দাবি করেন৷ কিন্তু বিরোধীদের দাবি খারিজ করে দিয়ে বিলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চিটফান্ড সংস্থাগুলি ব্যবসা করতে সাহসই না পায়, এজন্যই এই বিল আনা হয়েছে৷ তাতে, সরকারের কোন কুমতলব নেই৷ আইন কঠোর হলে চিটফান্ড সংস্থাগুলির ব্যবসা করতে সমস্যা হবে, দাবি অর্থমন্ত্রীর৷ তাতে, বিরোধীরা মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবিষয়ে তাঁর হস্তক্ষেপের দাবি জানান৷ মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, কোন স্বল্প সঞ্চয়ী সংস্থা রাজ্যে ব্যবসা করুক আমরা তাতে আগ্রহী না৷ কিন্তু ভারত সরকারের কঠোর কোন আইন নেই৷ এনিয়ে, রাজ্যের তদানিন্তন অর্থমন্ত্রী বাদল চৌধুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের তদানিন্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত বহুবার কেন্দ্রের কাছে আর্জি জানিয়েছেন চিটফান্ড সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের৷ যাই হোক কেন্দ্র যেহেতু তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়নি, তাহলে রাজ্য সরকারই চিটফান্ড সংস্থাগুলি যাতে ব্যবসা করতে না পারে সে ব্যবস্থা করুক, ইচ্ছা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তাতে তিনি বলেন, এই বিলের সংশোধনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হউক৷ পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীকে বলেন, আমরা কোন চিটফান্ড সংস্থাকে রাজ্যে ব্যবসাই করতে দেব না সেটা মাথায় রেখে পরীক্ষা করে দেখা হউক৷ আলোচনার ভিত্তিতে আইনী সংস্থান থাকলে চিটফান্ড সংস্থাগুলিকে রাজ্যে আর ব্যবসাই করতে দেওয়া হবে না এমন বিল আগামী বিধানসভা অধিবেশনে আনা সম্ভব হলে আপত্তির কিছু নেই, বলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এরপরই আমানতকারী সুরক্ষা বিল দ্বিতীয় সংশোধনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *