নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৬ ডিসেম্বর৷৷ পাঁচশত এবং একহাজার টাকার নোট আচমকা বাতিল করে দেবার দরুণ সবচেয়ে বেশী বিপাকে পড়েছে কৃষি ক্ষেত্র এবং কৃষকগণ৷ প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা আন্তঃসারশূন্য৷ সমস্যা হচ্ছে সাধারণ মানুষের৷ আজ রাজ্য বিধানসভায় বিধায়ক গোপাল চন্দ্র রায়ের আনা নোট বাতিল সম্পর্কিত একটি বেসরকারী প্রস্তাবের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার একথা বলেন৷ বিধায়ক বাসুদেব মজুমদার এই প্রস্তাবের উপর একটি সংশোধনী আনেন এবং সংশোধনী সহ প্রস্তাবটি ধবনি ভোটে গৃহীত হয়৷ এই প্রস্তাবটিতে নোট বাতিলের দরুণ সাধারণ মানুষের যে সমস্যা হচ্ছে তা তলে ধরে পর্যাপ্ত পরিমান নোট বাজারে না আসা পর্যন্ত পাঁচশত এবং একহাজার টাকার নোটে লেনদেন করার সুযোগ যাতে দেশের মানুষ পেতে পারেন তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে৷
আলোচনায় অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন৷ ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ ব্যবসা বাণিজ্য কমে গেছে৷ মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ণ কৃষি আক্রান্ত হলে শিল্প কী ভাবে হবে? তিনি বলেন, কর্মরতরা কাজ হারাচ্ছেন৷ চাকুরী প্রত্যাশীদের কাজের সুযোগ আরও কমে গেল৷ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের যে ভিত তৈরী হয়েছিল কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত তার উপর দারুণভাবে আঘাত এনেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেন দেশবাসী আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ এবং ১৯ ৭৮ সালে ভারতে নোট বাতিল করা হলেও এখনও এ ধরণের মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি৷ নগদহীন পদ্ধতি চালু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রচেষ্টা নিয়েছে ত ার তীব্র সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গ্রামের সব জায়গায় সোয়াইপিং মেশিন কোথা থেকে আসবে? অনেক জায়গায় তো ব্যাঙ্কের কোন শাখাই নেই৷ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৪ থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থ নগদ লেনদেন হচ্ছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে বক্তব্য না রেকে অন্যত্র নানা ধরনের কথা বলছেন৷ এখন সংসদ ভন্ডুল করছেন খোদ শাসক দলের সদস্যরা৷ এই অবস্থা থেকে বেরোতে হবে৷ দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের সময় যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার একটাও রূপায়ণ না করায় মানুষের দৃষ্টি সেদিক থেকে ঘুরিয়ে দেবার জন্যই নোট বাতিলের এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন৷ তিনি বলেন, জিনিষপত্রের দাম যেমন বাড়ছে তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও বেড়ে চলেছে৷ গত তিন বছরে দেশে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ২২ থেকে ৪৬ শতাংশ বেড়েছে৷ দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ করার চেষ্টা হলে তা মানুষ মনে নেবেন এটা ভাবলে ভুল হবে৷ প্রধানমন্ত্রী যে চারটি কারণে দেখিয়ে নোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা পরিসংখ্যান দিয়ে খন্ডন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাঙ্ক বলেছে ভারতের মোট জি ডি পি-র তেইশ দশমিক দুই শতাংশ হচ্ছে কালো টাকা৷ ২০১৬ সালেএটা কমেনি বরং বাড়ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে৷ এটা পঁচিশ শতাংশ ধরে হিসাব করে দেখা যাচ্ছে ২০১৫-১৬ সালে দেশে কালো টাকার পরিমাণ হবে ৩৭৫ লক্ষ কোটি টাকা৷ বলা হচ্ছে নগদ অর্থের ক্ষেত্রে কালো টাকা মূল হিসাবের পাঁচ শতাংশের বেশী নয়৷ সেদিক দিয়ে নোটের ক্ষেত্রে কালো টাকার পরিমান ১ লক্ষ কোটি টাকাটর মত হবে৷ মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ণ অবশিষ্ট ৩৬৫ লক্ষ কোটি টাকার কী হবে? তার মতে এড অধিকাংশই সোনা, রূপা, জমি, বাড়ী, শেয়ারমার্কেটে লগ্ণি করা আছে৷ এ বিষয়টি দিকে নজর না দিয়ে শুধুমাত্র নোট বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এটা ভাবা ঠিক নয়৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের সময় দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ১০০ দিনের মধ্যে বিদেশ থেকে কালো টাকা উদ্ধার করে প্রতিটি পরিবারের ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে ঢুকিয়ে দেয়া হবে৷ এখন প্রধানমন্ত্রী আর ওই জায়গায় যাচ্ছেন৷ এমনকী যাদের কালো টাকা আছে তাদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করা হচ্ছেনা৷ মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ণ ১ লক্ষ কোটি টাকার জন্য নোট বাতিল করতে হল এটা কেমন কথা? তিনি বলেন, কলকাতার সংস্থা স্ট্যাটসটিকেল নিস্টিটিউটের করা সমীক্ষা অনুযায়ী বাতিল নোটের মধ্যে ০০২৭ শতাংশ টাকা অর্থাৎ মাত্র ৪০০ কোটি টাকা জাল নোট৷ এই অর্থের জন্য পুরো নোটকেই বাতিল করতে হল৷ সন্ত্রাসবাদীদের অর্থের যোগান বন্ধ করা নোট বাতিলের অন্যতম কারণ হিসাবে দেখানো হলেও সন্ত্রাসবাদীরা নগদে লেনদেন করে থাকেন এই বিশ্বাস নির্বোধরাও করে থাকেন বলে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন না৷ নোট বাতিলের জন্য দুর্নীতি রোধ করাকে চতুর্থ কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হলেও বড় বড় পুঁজিপতিদের ঋণ মকুবের প্রসঙ্গঁটি উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী এই যুক্তিও খন্ডন করেছেন৷ তিনি বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিলে তা ফিরিয়ে দেবার জন্য কোন চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছেনা৷ দেশে নন পারফরমিং এ্যাসেটের পরিমান হচ্ছে ১১ লক্ষ কোটি টাকা৷ অথচ সাধারণ মানুষ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিলে তা যেকোন ভাবেই হোক আদায় করা হয়৷
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী ভানুলাল সাহা বলেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের দরুণ যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা এখনও জারী রয়েছে৷ এই সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের কর্মসংস্থানের আঘাত এসেছে৷ তিনি জানান, এখন পর্যন্ত রাজ্যে ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বাতিল নোট জমা পড়েছে৷ নতুন নোট এসেছে ১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা৷ ফলে রাজ্যবাসীও চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছেন৷ তিনি জানান, চা শ্রমিকদের মজুরী প্রদানে যাতে কোন সমস্যার সৃষ্টি না হয় সেই লক্ষ্যে রাজ্য সরকার উদ্যোগী হয়ে জেলা শাসকদের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করেছে৷ রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের গতমাসের বেতনের কিছু অংশ আগাম দেয়া হয়েছে৷ রাজ্যে ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমান নোটের ব্যবস্থা যাতে থাকে সেজন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং অন্য পদস্থ আধিকারিকগণ আর বি আই -র কর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন৷
2016-12-17