বিড়ম্বনায় শিশুরা

childrenভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু নিজের জন্মদিনটিকে শিশুদের জন্য উৎসর্গ করিয়া নিজেকে মানুষের মনে ঠাঁই করিবার পথ রচনার চেষ্টায় কতখানি সাফল্য রাখিয়াছেন তাহাই আজ বিশ্লেষণের সময় আসিয়াছে৷ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ তাঁহার জন্মদিনটি শিক্ষক দিবস হিসাবে উৎসর্গ করিয়াছেন৷ দেশের দুই ব্যক্তিত্ব নিজের জন্মদিনকে স্মরণীয় করিবার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য৷ জওহরলাল নাকি শিশুদের খুব ভালবাসিতেন৷ শিশুরা নাকি ভগবানের দূত৷ এই বিশ্বাসও আছে অনেকের মনে৷ নিষ্পাপ, কোমল এই শিশুদের ভালবাসে না এমন লোক খঁুজিয়া পাওয়া কঠিন৷ ১৪ই নভেম্বর শিশু দিবস পালনের ক্ষেত্রেও তেমন উৎসাহ আছে এমন মনে হয় না৷ অথচ এই দিনটি কতবেশী গুরুত্বপূর্ণ তাহা তো নতুন করিয়া বলিবার অপেক্ষা রাখে না৷ আজকের শিশুদের শৈশব তো হারাইয়া গিয়াছে৷ ইট পাথরের দেয়ালে তাহারা বন্দী৷ সবুজ ঘাস, গাছপালার হাট, তেপান্তরের মাঠ তো ভাবতেই পারে না আজকের শিশুরা৷ অমর কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের সেই ‘অপু’কে খঁুজিয়া পাওয়া দুষ্কর৷ সেই বিস্ময় ভরা চোখ, সেই রেল লাইনের ধারে টৈলিফোনের পোষ্টে কান লাগাইয়া শোনা, রেলের ঝিকি ঝিকি আওয়াজ, কাশবনে দৌঁড়ঝাপ৷ আজকের দিনে শিশুদের শৈশব কাটে চার দেয়ালের বন্দীদশায়৷ পড়া আর পড়া৷ দৌঁড় আর দৌঁড়৷ ভারী ব্যাগ কাঁধে ঝুলাইয়া সুকলে ছুটা৷ বাড়ীতে বইয়ে চোখ নিবদ্ধ রাখা৷ খেলাধুলার ফুরসৎ নাই৷ তাহাদের শৈশব হারাইয়া গিয়াছে৷ এই শৈশব বঞ্চিত শিশুদের সামনে পড়িয়া আছে ‘ডিজিটাল দুনিয়া’৷ সেই টিভির পর্দায় চোখ রাখিয়া যাওয়া৷ এখন আর শিশুদের শৈশব নাই৷ যেন প্রাণহীন, বন্দী জীবনে বড় হওয়া৷ যেখানে মায়া মমতা স্নেহ ভালবাসা হারাইয়া এক যান্ত্রিক হইয়া উঠা৷ আজকের এই শিশু দিবসে এই ভাবনাই তো বড় হইয়া দেখা দিয়াছে৷
শিশুরাই দেশের ভবিষ্যত৷ সুস্থ সবল শিশুই দেশের সম্পদ৷ জাপানে রাষ্ট্রযন্ত্র শিশুদের জন্য উদার হস্ত৷ এই দেশই বিশ্বকে বার্তা দিয়াছে শিশুদের যত্ন, তাহাদের সুস্থ সবল ভাবে গড়িয়া তোলাই সব চাইতে বড় কাজ৷ আজ এই ভারতবর্ষের শিশু চিত্র তো গভীর উদ্বেগ উৎকন্ঠাই তুলিয়া ধরে৷ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হইলেও লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রম দিতেছে৷ খুব স্বল্প পারিশ্রমিকে শিশুদের নির্মম ভাবে ব্যবহার করা হইতেছে৷ তাহাদেরকে শিক্ষার অধিকার, বাঁচার অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইতেছে৷ শিশু উন্নয়নের গাল ভরা বুলিই সার৷ রাষ্ট্র যন্ত্রের এই কীর্তি আমাদের সামনে ভয়ানক পরিস্থিতিকেই আমন্ত্রণ জানাইতেছে৷ গরীব অংশের শিশুরা শিক্ষার অধিকার হইতে শুধু বঞ্চিত হইতেছে না পৃথিবীর আলো হইতেও বিচ্ছিন্ন থাকিতেছে৷ আজ শিশু দিবস নমঃ নমঃ করিয়া হইলেও পালিত হয়৷ ভবিষ্যতে তাহাও থাকিবে কিনা সন্দেহ৷ শিশুদের উন্নয়নের গালভরা বুলি শিশুদের মনেও এখন রেখাপত করিতেছে৷ এই শিশুরাই রুখিয়া দাঁড়াইতে পারে৷ সেই সময় বোধহয় আসিতেছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *