বিজেপি ও তৃণমূল মিলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হচ্ছে ঃ মানিক সরকার

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৩ নভেম্বর৷৷ নীতির প্রশ্ণে কাদের সমর্থন করবেন মানুষ, রাজ্যে দুটি আসনে উপনির্বাচনের

রবিবার নতুননগর সুকল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখছেন সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ নিজস্ব ছবি৷
রবিবার নতুননগর সুকল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখছেন সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ নিজস্ব ছবি৷

ফলাফলে তা প্রতিফলিত হবে বলে মনে করেন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ তাঁর মতে, আড়াই বছরে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্মের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে তার ভিত্তিতে তাদের নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে৷ আর তৃণমূল কংগ্রেসের নীতি নিয়েই ধোঁয়াশা রয়েছে৷ কখনো তারা বিজেপির সাথে ঘর করছেন, আবার কখনো কংগ্রেসের সাথে জোট বাঁধছেন৷ মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে বলেন, এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল মিলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ ফলে, রাজ্যে দুটি আসনে উপনির্বাচনের ফলাফলে সরকার পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা না থাকলেও, তাতে মানুষ কাদের নীতিকে সমর্থন করছেন সেটা ভালভাবেই প্রতিফলিত হবে৷ রবিবার নতুননগর সুকল মাঠে বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী ঝুমু সরকারের সমর্থনে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় এই তত্ব তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷
মূলত, উপনির্বাচনের ফলাফলে শাসক দল সিপিএম মানুষ কাদের বক্তব্যকে সমর্থন করছেন তা জানতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ কারণ, দুটি আসনে উপনির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গণদেবতাদের সামনে তাদের মত ব্যক্ত করছে৷ বিজেপি, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস প্রত্যেকেই নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য রাখছে৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সাথে ঐ বক্তব্যের সাযুজ্য কতটা রয়েছে সেই প্রশ্ণই আজ মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় তুলেছেন৷ তিনি বলেন, বিজেপি এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে৷ কংগ্রেস এখন দুর্বল হলেও এক সময় দিল্লিতে সরকার চালিয়েছে৷ রাজ্যেও ৩২/৩৩ বছর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে ছিল৷ আর তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ৫ বছর সমাপ্ত হয়ে ৬ষ্ঠ বৎসরে পদার্পণ করেছে৷ ফলে, নীতির প্রশ্ণে বর্তমান পরিস্থিতি কি এদিন মুখ্যমন্ত্রী জনসমাবেশে উপস্থিত মানুষের উদ্দেশ্যে প্রশ্ণ ছঁুড়ে দেন৷ বিজেপি নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গত ৩০ মাসে সরকার চালাতে গিয়ে কোনটাই রাখতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, এই আড়াই বছরের অভিজ্ঞতায় বাকি দিন কিরকম যাবে তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷ অবশ্য বিজেপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ পঁুজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা বলে মনে করেন তিনি৷ তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জিনিসের দাম কমানো, কৃষকদের লাভবান করা ইত্যাদি কোনটাই সম্ভব হয়নি পঁুজিপতিদের স্বার্থ রক্ষায়৷ তিনি বলেন, দলীয় সাংসদরা বার বার দাবি করছেন ১৪টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গোটা দেশে সরবরাহ করার জন্য৷ কৃষকদের কাছ থেকে সহায়ক মূল্যে সরাসরি সরকার চাল, গম ইত্যাদি ক্রয় করুক সেই দাবিও বহুবার জানানো হয়েছে৷ কিন্তু বর্তমান সরকার তা মানতে পারছে না৷ কারণ, রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করা হলে পঁুজিপতিরা মুনাফা কামাতে পারবেন না৷ অন্যদিকে, সরকার যদি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সহায়ক মূল্যে চাল, গম ইত্যাদি ক্রয় করে তাহলেও পঁুজিপতিদের মুনাফা অর্জনে সমস্যা হবে৷ কারণ, তাঁরা স্বল্পমূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে চাল, গম, ডাল ইত্যাদি ক্রয় করে গুদামে মজুতের মাধ্যমে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করেন এবং সুযোগ বুঝে অধিক মুনাফায় বিক্রি করেন৷ মুখ্যমন্ত্রী এদিন, কটাক্ষের সুরে বলেন, পঁুজিপতিদের ধমকের সামনে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার মাথা নুইয়ে দিয়েছে৷ অবশ্য এক্ষেত্রে কংগ্রেসের সাথে বিজেপির নীতিগত কোন ফারাক নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন৷
এদিকে, দেশে বিজেপি যে বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে তার জন্যও পঁুজিপতিরাই দায়ী বলে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন৷ তাঁর দাবি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় দেশের মানুষ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ৷ তাই ধর্মের নামে বিভাজন সৃষ্টি করে বিজেপির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে৷ আর এই প্রয়াসের বাস্তবায়নে ধর্মের নামে সংঘর্ষ হবে বলে তাঁর ধারণা৷ কারণ, আড়াই বছরে এক হাজারের ওপর সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে৷ তাতে লক্ষ্য হল হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলা৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্মের নামে বিভাজন কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না৷ কারণ, ধর্ম ব্যক্তিগত হলেও উৎসব সকলের জন্য৷ আর এই জন্যই এদেশে সকল ধর্মের উৎসবে সব অংশের মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকেন৷
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস অরাজকতা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী৷তিনি বলেন, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস পশ্চিমবঙ্গে এখন সমানভাবে চলছে৷ চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দলীয় সাংসদ জেল খেটেছেন৷ সিবিআই যখন তখন তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের ডেকে পাঠাচ্ছে৷ এদিকে, সন্ত্রাসও মারাত্মকভাবে বেড়েছে পশ্চিমবঙ্গে বলে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন৷ তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে এখন তৃণমূলী সন্ত্রাসে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে৷ এক দলীয় স্বৈরশাসন কায়েম করার চেষ্টা চলছে৷ পাশাপাশি তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, বিজেপির সহায়তাতেই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল আবার ক্ষমতায় এসেছে৷ কারণ, সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যস্তরের এক নেতা জানিয়েছেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে বিজেপি মদত দিয়েছে৷ আর পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপি ও তৃণমূল মিলে যেভাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা চলছে তাতে তাঁদের মধ্যে যে বোঝাপড়া রয়েছে সেটাই প্রমাণিত হচ্ছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এই সমস্ত কারণে, দুটি আসনে উপনির্বাচনের ফলাফলে মানুষ কাদের নীতিকে সমর্থন করছেন তার ভিত্তিতে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের লক্ষ্যে মূল্যায়ন করতে সুবিধা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *