নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৫ জুন৷৷ এডিসি দখলে সম্ভবত পর্দার আড়ালে থেকেই রাজনীতির পাশা খেলা শুরু করে দিয়েছেন প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মন৷ অবশ্য তাতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ত্রিপুরা পিপলস্ ফ্রন্টকে৷ করোনা অতিমারির প্রকোপের মাঝেও এডিসি ইস্যুতে পাহাড় রাজনীতিকে কার্য্যত উত্তপ্ত করে তুলেছে টিপিএফ৷ ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদের (এডিসি) দায়িত্ব প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মণকে হস্তান্তরের দাবিতে আজ রাজ্যের সাতটি স্থানে রাস্তা অবরোধ শুরু করেছে ত্রিপুরা পিপলস ফ্রন্ট (টিপিএফ)৷ অবশ্য, তাতে প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মনের ইন্ধন রয়েছে কি না তা জানা সম্ভব হয়নি৷ তবে, এডিসি ইস্যুতে আগামীদিনে পাহাড় ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে, টিপিএফ সুপ্রিমো পাতালকন্যা জমাতিয়ার কড়া হুশিয়ারীতে তার আভাস মিলেছে৷
পাতালকন্যা জমাতিয়ার সাফ কথা, এডিসি-র মেয়াদ সমাপ্ত হওয়ার পর রাজ্যপালের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রশাসক নিযুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বেআইনি৷ কারণ, সংবিধান মেনে সর্বদলীয় বৈঠক ছাড়াই অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিককে প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়েছে৷ এতে জনজাতিদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে৷ এজন্যই আজ রাজ্যপালের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় এবং ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যুৎ কিশোরের হাতে এডিসি-র ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে দিনভর অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, বলেন তিনি৷
এদিকে টিপিএফ-এর এই দাবিকে অসাংবিধানিক বলে কড়া সমালোচনা করেছেন শাসক দল বিজেপি-র মুখপাত্র নবেন্দু ভট্টাচার্য৷ একইভাবে টিপিএফ-এর এই আন্দোলনকে সমালোচনায় বিঁধলেন বামফ্রন্টের কনভেনর বিজন ধর৷ তাঁর সাফ কথা, মেয়াদ সমাপ্ত হলে নিয়ম মেনে প্রশাসক নিযুক্ত করতে হয়৷ কিন্তু এই ইস্যুতে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রকোপের মধ্যে আহূত রাস্তা অবরোধের মতো আন্দোলনকে সমর্থন করা যায় না৷
প্রসঙ্গত, গত ১৭ মে এডিসি-র মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে৷ এর পর ত্রিপুরা সরকার এডিসি-র ক্ষমতা রাজ্যপালের হাতে হস্তান্তর করেছে৷ রাজ্যপাল এডিসি-র প্রশাসক হিসেবে প্রাক্তন মুখ্যসচিব জি কে রাওকে নিযুক্তি দিয়েছেন৷ রাজ্যপালের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছে টিপিএফ৷ আজ ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় ত্রিপুরার সাতটি স্থানে রাস্তা অবরোধ আন্দোলন শুরু করেছে৷ এ-বিষয়ে পাতালকন্যা জমাতিয়া বলেন, এডিসি-তে প্রশাসক নিযুক্তিতে জনজাতিদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে৷ কারণ, রাজ্যপাল নয়, জনগণ এডিসি গঠন করে থাকেন৷ তাই, জনগণের রায় নিয়ে এডিসি-তে প্রশাসক নিয়োগ করা উচিত ছিল৷
তাঁর বক্তব্য, এডিসি-তে প্রশাসক নিযুক্তির ক্ষেত্রে রাজ্যপাল সর্বদলীয় বৈঠক করেননি৷ এতে তিনি জনজাতিদের ভাবাবেগে আঘাত করেছেন৷ কারণ, জনজাতিদের সাথে সম্পর্ক নেই এমন ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে তিনি নিযুক্তি দিয়েছেন৷ পাতালকন্যা জমাতিয়ার কথায়, গত ২৩ মে রাজ্যপালের কাছে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ডেপুটেশন দিয়েছিলাম৷ সাতদিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনের বিষয়ে জানিয়েছিলাম৷ কিন্তু আমাদের দাবি মেনে নেননি রাজ্যপাল৷ তাই, আজ বাধ্য হয়ে আমরা রাস্তা অবরোধ করেছি৷ তিনি জানান, বড়মুড়ার খামতিংবাড়ি, এডিসি সদর খুমুলুঙ, খোয়াই জেলার বাইজলবাড়ি, ধলাই জেলার আমবাসা, উদয়পুর মহকুমার মহারানিপুর, গোমতি জেলার অমরপুর, দক্ষিণ জেলার বীরচন্দ্র মনু এবং কুমারঘাট মহকুমার ডেমদুং এলাকায় রাস্তা অবরোধ করা হয়েছে৷
পাতালকন্যা জমাতিয়া সাফ বলেন, জনগণের দাবি মেনে রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যুৎকিশোর দেববর্মণকে এডিসি-র দায়িত্ব দিতে হবে৷ এক মাসের মধ্যে ত্রিপুরা সরকার এই পদক্ষেপ না নিলে রাজ্যে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি৷ কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এ ধরনের আন্দোলন সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে হচ্ছে, এর জবাবে তিনি বলেন, বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছি৷ সরকার আমাদের দাবি না মানলে আগামীদিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলন হবে৷
আজ টিপিএফ-র এই আন্দোলনকে চাঁচাছোলা ভাষায় বিঁধেছেন শাসকদল বিজেপি-র মুখপাত্র নবেন্দু ভট্টাচার্য৷ তাঁর সাফ কথা, প্রদ্যুতের হাতে এডিসি-র দায়িত্ব তুলে দেওয়ার দাবি অসাংবিধানিক৷ কারণ, তিনি কোনও সাংবিধানিক পদাধিকারী নন৷ নবেন্দুবাবু বলেন, এডিসি-র মেয়াদ সমাপ্ত হওয়ায় বর্তমান অতিমারির পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিযুক্ত করা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ খোলা ছিল না৷ কারণ, এখন নির্বাচন সম্ভব হচ্ছে না৷ তাঁর দাবি, সংবিধান মেনেই রাজ্যপালের হাতে এডিসি-র ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে৷ তিনিও সংবিধান মেনেই প্রশাসক নিযুক্ত করেছেন৷ আজ টিপিএফ যে দাবি তুলেছে তাতে স্পষ্ট, সংবিধান সম্পর্কে তাঁদের ন্যূনতম ধারণা নেই, কটাক্ষের সুরে বলেন তিনি৷ সুর আরও চড়িয়ে নবেন্দু বলেন, প্রদ্যুতের অবস্থান নিয়েই আমাদের সন্দেহ হচ্ছে৷ তাই, দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কারোর কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু জনস্বার্থ এবং জনগণের সুবিধা ক্ষুণ করে নয়৷
এদিকে, টিপিএফ-এর এই আন্দোলনকে সমর্থন করেনি বামফ্রন্টও৷ বরং তাঁদের সুবিধাবাদী হিসেবে বিঁধেছেন বামফ্রন্ট কনভেনর বিজন ধর৷ বিজনবাবুর কথায়, সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী এডিসি-র মেয়াদ সমাপ্ত হলে প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়৷ রাজ্য সরকারই সেই সিদ্ধান্ত নেয়৷ কিন্তু, কোনও একজন ব্যক্তিকে এডিসি-র ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য বলা উচিত নয়৷ শুধু তা-ই নয়, কোভিড-১৯ অতিমারির পরিস্থিতিতে দাবি আদায়ে রাস্তা অবরোধ কোনও অবস্থায় সমর্থনযোগ্য নয়৷ তিনি কটাক্ষ করে বলেন, টিপিএফ সুবিধাবাদী পার্টি৷ তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলতে চাই না৷ তবে, সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে এডিসি নির্বাচন হোক চাইছি৷
এদিন, আইপিএফটির সভাপতি তথা রাজস্ব মন্ত্রী এন সি দেববর্মা রাস্তা অবরোধের বিরোধীতা করেছেন৷ তাঁর দাবি, প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মনকে এডিসির ক্ষমতা হস্তান্তর সাংবিধানিক ভাবে সম্ভব নয়৷ তবে, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন৷ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে করোনা অতিমারীর বিপর্য্যয়ের মুহুর্তে এই ধরনের আন্দোলন অশুভনীয় এবং অযাচিত৷ এদিকে, আইএনপিটিও এই ইস্যুতে ত্রিপুরা পিপলস ফ্রন্টের দাবীকে সমর্থন করেনি৷ দলের সাধারণ সম্পাদক জগদিশ দেববর্মার কথায়, টিপিএফ তাদের সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে রাস্তা অবরোধ করেছে৷ কিন্তু, লকডাউনে এখনই এই আন্দোলনে যাওয়া উচিৎ হয়নি৷ তিনি এডিসির ক্ষমতা রাজ্যপালের হাতে হস্তান্তর এবং প্রশাসক নিযুক্তি সাংবিধানিক রীতি মেনেই হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন৷

