নিজস্ব প্রতিনিধি, তেলিয়ামুড়া/ আগরতলা/ বিরাশিমাইল/ চড়িলাম/ কাঞ্চনপুর, ১০ ডিসেম্বর৷৷ নাগরিকত্ব সংসোধনী বিলের বিরোধীতায় বন্ধের দ্বিতীয় দিনে অগ্ণিগর্ভ রূপ নিল রাজ্য৷ একাধিক স্থানে দোকানপাট লুট, গাড়ি-বাড়ি ভাঙচুর, অগ্ণিসংযোগ এবং আক্রমণের ঘটনায় পুলিশ সহ বহু আহত হয়েছেন৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চালাতে হয়েছে গুলি ও কাঁদানে গ্যাস৷ ১৪৪ ধারাও জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে৷ শুধু তাই নয়, গুজবের হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে আটচল্লিশ ঘন্টা মোবাইল ইন্টারনেট এবং এসএমএস পরিষেবা বদ্ধ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার৷

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় বনধে ত্রিপুরায় ধলাই জেলার মনু-তে পরিস্থিতি অগ্ণিগর্ভ রূপ নিয়েছে৷ বনধ সমর্থকরা মনুঘাট বাজারে ১টি বাইক পুড়িয়ে দিয়েছে এবং ৫টি বাইক ভেঙেছে৷ তাছাড়া, ৩২টি দোকানে ভাংচুর করেছে৷ এখানেই থেমে থাকেননি তারা৷ ফল ব্যবসায়ী কৃপাসিন্ধু চক্রবর্তীকে(৫২) কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছেন বনধ সমর্থকরা৷ স্থানীয় হাসপাতাল থেকে তাঁকে আগরতলায় জি বি হাসপাতালে স্থানান্তর করেছেন চিকিৎসকরা৷ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ ও টিএসআর বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে৷
আজ সকাল থেকেই মনুঘাট এলাকায় বনধ সমর্থকরা পিকেটিং করেছে৷ বেলা যত গড়িয়েছে তারা ততই উগ্র রূপ নিয়েছে৷ প্রথমে মনুঘাট এবং ৮২ মাইল বাজারে ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ করার জন্য হুমকি দিয়েছিল তারা৷ কিন্তু তাতে কোন কাজ না হাওয়ায় তারা মারমুখি হয়ে উঠেন৷ মনুঘাট বাজারে বনধ সমর্থকরা ৩২টি দোকানে ভাংচুর করেছে৷ পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণ প্রাণে বাঁচতে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি শুরু করে দেন৷ বনধ সমর্থকরা বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাইকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এবং ৫টি বাইক ভাংচুর করেছে৷ প্রত্যাক্ষদর্শীর বক্তব্য, বাইকটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে৷
এদিকে, ফল ব্যবসায়ী কৃপাসিন্ধু চক্রবর্তীকে বনধ সমর্থকরা প্রচণ্ড মারধর করেছে৷ তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে৷ যতদূর জানা গেছে, তাঁর মাথায় দায়ের কোপ পড়েছে৷ তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁর অবস্থা দেখে তাকে আগরতলায় জি বি হাসপাতালে স্থানান্তর করেছেন৷ অন্যদিকে, বনধ সমর্থকদের আক্রমণে মনুঘাট বাজারে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন৷ তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ বাগানবাড়ি এলাকাতেও বনধ সমর্থকরা তাণ্ডব চালিয়েছে৷ সেখানে ৪টি বাড়িতে বাউন্ডারি বেড়া ভাংচুর করেছে৷ এদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ, টিএসআর সাথে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে৷ দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বাইকের আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে৷ তাছাড়া, আহতদের হাসপাতালে পৌছে দেওয়ার কাজ করছেন তারা৷ আপাতত, পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে হলেও এখনও স্বাভাবিক হয়ে উঠেনি৷ ভয়ে কেউ বাড়িঘর থেকে বের হচ্ছেন না৷ রাস্তাঘাট, বাজার শুনশান৷
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় হিংসার আগুন কাঞ্চনপুর মহকুমায় ছড়িয়েছে৷ বনধ সমর্থকদের আক্রমণে ১৩ জন আহত হয়েছেন৷তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হাওয়ায় তাঁকে ধর্মনগর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে৷ তারা দোকানপাট ভাংচুর করেছে, গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে৷ একটি বাড়িতেও ভাংচুর করেছে৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শূন্যে ৪ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে৷ কাঞ্চনপুর ও আনন্দবাজার এলাকায় মহকুমা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷ এদিকে, গুজব এড়ানোর জন্য পুলিশ প্রশাসন মোবাইল ইন্টারনেট এবং এসএমএস পরিষেবা বন্ধের নির্দেশিকা জারি করেছে৷
এদিন উত্তেজনার সূচনা হয়েছে লালঝুরি থেকে আসা পিকেটারদের উপর মারধরকে কেন্দ্র করে৷ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় নেসু-র ডাকা বনধে উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাঞ্চনপুরে পিকেটিং করতে লালঝুরি, দশদা এবং আনন্দবাজার থেকে পিকেটাররা আসছিলেন৷ কাঞ্চনপুর হাসপাতালের সামনে পিকেটারদের গাড়ি আটকে তাদের মারধর করা হয়েছে অভিযোগ উঠেছে৷ পিকেটারদের গাড়িতে ভাংচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ৷ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা মহকুমায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে৷
ওই মারধরের ঘটনার জেরে বনধ সমর্থকরা বড় মাত্রায় লাঠি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন৷ তারা কাঞ্চনপুর, দশদা ও আনন্দবাজার এলাকায় তাণ্ডব শুরু করেন৷ দোকানপাট, গাড়ি ভাংচুর করেছেন বনধ সমর্থকরা৷ বাজারে ঢুকে তারা সমস্ত দোকানপাট তছনছ করে দিয়েছে৷ তাদের আক্রমণে ১৩ জন নিরীহ মানুষ আহত হয়েছেন৷ বনধ সমর্থকরা গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন৷ পরিস্থিতি অগ্ণিগর্ভ হয়ে উঠলে পুলিশ, টিএসআর এবং কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী নিয়ে মাঠে নামেন কাঞ্চনপুর মহকুমা শাসক অভেদানন্দ বৈদ্য৷
মহকুমা প্রশাসন বনধ সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার আবেদন জানালেও তাতে তারা সে দেয়নি৷ উল্টে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে তারা ইট, পাটকেল, পেট্রল বোমা ছুড়তে শুরু করে৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শূন্যে চার রাউন্ড গুলিও ছুড়েছে৷ কিন্তু, তাতেও তাদের উৎশৃঙ্খলতা দমে না যাওয়ায় মহকুমা প্রশাসন কাঞ্চনপুর এবং আনন্দবাজার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷
এদিকে, বনধ সমর্থকদের আক্রমণে আহতদের কাঞ্চনপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হাওয়ায় তাকে ধর্মনগর হাসপাতালে স্থানান্তর করেছেন চিকিৎসকরা৷ অন্যদিকে, কোনরকম গুজব এড়ানোর লক্ষ্যে ত্রিপুরায় মোবাইল ইন্টারনেট এবং এসএমএস পরিষেবা সাময়িক স্থগিত রাখার নির্দেশিকা জারি করেছে পুলিশ প্রশাসন৷ কাঞ্চনপুরে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সারা ত্রিপুরায় গুজব ছড়াতে পারে, আশঙ্কা করছে পুলিশ৷ তাই, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ করেছে পুলিশ৷
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় বনধের জেরে অশান্তির আগুন ত্রিপুরায় একাধিক স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে৷ মনু, কাঞ্চনপুরের পর বিশ্রামগঞ্জের দেওয়ানবাজারেও বনধ সমর্থকদের উগ্র আচরণে তিনজন পুলিশ কর্মী আহত হয়েছেন৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ছঁুড়তে হয়েছে৷ জল কামান নিয়েও পুলিশ প্রস্তুত ছিলেন৷ তবে, কাঁদানে গ্যাস ছঁুড়তেই এবং পুলিশের কঠোর অবস্থানে বনধ সমর্থকরা পালিয়ে যান৷ এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে বিশালগড় মহকুমা শাসক জানিয়েছেন৷
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিশ্রামগঞ্জ দেওয়ানবাজার এলাকায় জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বনধ সমর্থকরা৷ দীর্ঘক্ষণ অবরোধ থাকার পর ঘটনাস্থলে যান সিপাহিজলা জেলার পুলিশ সুপার ও মহকুমা পুলিশ আধিকারিক৷ বনধের সমর্থনে তারা অবরোধ তুলবে না বলে অনড় অবস্থান নেওয়ায় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে৷ পুলিশ ৪০ জন বনধ সমর্থককে গ্রেপ্তার করে গোমতী জেলা শাসক কার্যালয়ের পাশে নিয়ে রাখেন৷
এই ঘটনায় অন্য বনধ সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে উঠেন৷ তারা দেওয়ানবাজার এলাকায় এসে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল ছঁুড়তে শুরু করেন৷ তাদের দাবি, আটক পিকেটারদের মুক্তি দিতে হবে৷ এনিয়ে বনধ সমর্থকদের সাথে পুলিশের তীব্র বাদানুবাদ হয়৷ এক সময় পুলিশ ও বনধ সমর্থকদের মধ্যে বচসা থেকে পরিস্থিতি খন্ড যুদ্ধের রূপ নেয়৷ উত্তেজিত বনধ সমর্থকরা একটি টিএসআরের গাড়ি ভাঙচুর করেন৷ তাছাড়া বনধ সমর্থকদের আক্রমণে তিনজন পুলিশ ও টিএসআর জওয়ান আহত হয়েছেন৷ ত্রিপুরা পুলিশের কর্মী সুশান্ত দাস ও রাজীব দত্ত এবং টিএসআর নায়েক সুবেদার দীনেশ দেববর্মা বনধ সমর্থকদের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে দুইজনকে বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে এবং একজনকে গোমতী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷
এদিকে, বনধ সমর্থকদের দাবি মেনে আটক পিকেটারদের মুক্তি দেয় পুলিশ৷ কিন্তু, এরপর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে৷ খবর পেয়ে সিপাহিজলা জেলার জেলাশাসকের দায়িত্বে থাকা গোমতী জেলা শাসক, বিশালগড়ের ডিসিএম, সিপাহিজলা জেলা পুলিশ সুপার সহ পদস্থ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান৷ এরই মধ্যে বনধ সমর্থকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল ছঁুড়তে থাকেন৷ পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছঁুড়ে৷ তাছাড়া সেখানে জলকামান নিয়েও প্রস্তুত ছিল পুলিশ৷ কাঁদানে গ্যাস এবং পুলিশের লাঠির ভয়ে বনধ সমর্থকরা পালিয়ে যান৷ এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে৷ তবে, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ সতর্ক রয়েছে৷

