
গুয়াহাটি, ২৫ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : বিজেপি সরকারের ওপর চটে লাল অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ। বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) আইনে পরিণত করে ঐতিহাসিক অসম চুক্তি এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-কে বর্জ্য কাগজের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে বিজেপি সরকার। বুধবার দিশপুরে নিউ মিনিস্টার্স কলোনির সরকারি আবাসে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গগৈ। সাংবাদিক সম্মেলনে গগৈ বলেন, বিজেপি এবং আরএসএস নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ করাতে উঠে-পড়ে লেগেছে। এই বিল পাশ করে তারা অসম চুক্তি এবং এনআরসিকে ছুঁড়ে ফেলতে ব্লুপ্রিন্ট রচনা করেছে।
শঙ্কা প্রকাশ করে তরুণ গগৈ বলেন, ক্যাব চালু অসমের ভাষা, কলা-সংস্কৃতি শেষ হয়ে যাবে। তাঁর অভিযোগ, জাতি-মাটি-ভিটে বিক্রি করতে মাথা মারছে বিজেপি। মোদী ও অমিত শাহকে ‘হয় হুজুর’ করে অসমিয়া জাতির ধ্বংসযজ্ঞ পেতেছে প্রদেশ বিজেপি। অগপ সভাপতি অতুল বরা, দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্ৰফুল্ল মহন্তও এতে ঘি ঢালছেন। মুখেই কেবল তাঁরা ক্যাব-এর বিরোধিতা করছেন। ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার কথা অহর্নিশি মুখে বলে থাকেন, কিন্তু এখন অগপ-র স্থিতি নরম বলে দেখা যাচ্ছে। এর রহস্য কী জানেন না তিনি, বলেন গগৈ।
তবে সারা অসম ছাত্র সংস্থা (আসু), অসম সাহিত্য সভা এবং কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতির মতো সংগঠনগুলোর পদক্ষেপও বাঞ্ছনীয় নয় বলে অভিযোগ করেছেন তরুণ গগৈ। বলেন, ‘এই সব সংগঠন আগে বিরোধিতা করলেও এখন মুখে কলুপ এঁটে বসে রয়েছে। ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আগে যে-কোনও ব্যাপারে আমাদের গালাগাল দিত। এখন চুপ কেন? মনে হচ্ছে বিজেপি-র সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেছে। তাদের আচরণ সন্দেহজনক।’ তবে এর পিছনে ‘কোনও লেনদেন হয়েছে’ কি না তা বলছেন না, কারণ ‘হাতে প্ৰমাণ নেই’।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি অভিযোগ তুলে বলেন, বিজেপি ও আরএসএস দেশে এক সংস্কৃতি, এক জাতি, এক ধৰ্ম এবং এক দলীয়রাজ কায়েম করতে চাইছে, এই প্রবণতা গণতন্ত্ৰের জন্য ক্ষতিকারক, বলেন প্ৰাক্তন মুখ্যমন্ত্ৰী। হিন্দু বাংলাদেশিরা নির্যাতনের বলি হয়ে ভারতে এসেছেন বলে বিজেপি-র প্রচার সম্পর্কে গগৈয়ের মন্তব্য, ‘আমার আমলে নির্যাতনের বলি হয়ে ভারতে এসেছেন বলে একজনও আবেদন জানাননি, মহন্তের আমলেও (প্রফুল্ল মহন্ত নেতৃত্বাধীন অগপ-র দশ বছরের কার্যকাল) কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে আসেননি। ১৯৮৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত একজন শরণাৰ্থীও নির্যাতনের বলি হয়ে আসেননি। বিজেপি-আরএসএসরা এখন শরণাৰ্থীদের আমন্ত্ৰণ করছে।’
প্ৰাক্তন সতীৰ্থ এবং বর্তমান বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্ৰী হিমন্তবিশ্ব শর্মার ওপর অন্যদিনের মতো আজও হামলা করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী গগৈ। বলেন, ‘হিমন্তবিশ্ব শর্মা এনআরসি রিজেক্ট করার কে? কেন্দ্ৰীয় সরকার তা রিজেক্ট করতে পারে। তবে তাদেরও রিজেক্ট করা এত সহজ নয়। যদি ক্যাব আনার এতই ইচ্ছে ছিল তা-হলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে কেন এনআরসি তৈরি করেছে তারা? আমরা এনআরসি রিজেক্ট করব না, তবে তার পুনর্যাচাই দাবি করি।’ প্রসঙ্গত, রাজ্যের মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব সম্প্রতি করিমগঞ্জে এক সমাবেশে বলেছিলেন, প্রকাশিত এনআরসি জাতির দলিল নয়। ক্যাব আইনে পরিণত হয়ে গেলে এর কোনও প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না। ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে পৃথিবীর যে কোনও দেশ থেকে ভারতবর্ষে আশ্রিত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য বিজেপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হিমন্তের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে তরুণ গগৈ আজ তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক আমেরিকা সফরে ‘হাউডি মোদী’ অনুষ্ঠানকেও কটাক্ষ করেছেন গগৈ। বলেন, ‘দুজনেই ভালো নাটক করেছেন। মোদী অমিতাভ বচ্চনের মতো অভিনয় করেছেন, ট্ৰাম্প-তো অভিনয়ে আরেক ধাপ ওপরে। ভালো করে জড়িয়ে ধরে দুজনেই মনোরঞ্জনাত্মক অভিনয় করেছেন। ট্ৰাম্প কিন্তু কম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন মোদীর সঙ্গে আলিঙ্গন করার পরের দিনই। পাকিস্তান সন্ত্ৰাসী কার্যকলাপ চালিয়েছে বলে তিনি কিন্তু কখনও সরাসরি বলেননি।’
রাজ্যের সাম্প্ৰতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অসমে লরা রাজার শাসন চলছে। রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে, কোনও নিয়ন্ত্ৰণ নেই সরকারের। এরা কেবল কমিশনে ব্যস্ত। পুলিশ আধিকারিকদের সিন্ডিকেটে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। যোরহাট কাণ্ডের মূল অভিযুক্তকে চাৰ্জশিটে সাক্ষী সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে তিনি বিজেপি নেতা বলে।’ রাজ্যে উপনিৰ্বাচনের আচরণবিধি জারি হওয়ার পরও গতকাল সরকার দু-দুটি প্রকল্পে ঘোষণা এবং উদ্বোধন করেছে বলেও সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ।

