
নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট (হি.স.) : পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং আকসাই চিনও যে জম্মু ও কাশ্মীরের অঙ্গ। আর জম্মু ও কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মঙ্গলবার তা ফের মনে করিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাশাপাশি এদিন জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির প্রস্তাব পাশ হলে যায় লোকসভায়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৩৫১ এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৭২টি। এছাড়াও এদিন লোকসভায় পাশ হয় জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯। প্রস্তাবে পক্ষে ভোট পড়েছে ৩৭০ এবং বিপক্ষে ৭০টি ভোট পড়ে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ পাকিস্তানের প্রশাসন যে মোটেও ভাল চোখে দেখছে না পাকিস্তান তা মনে করিয়ে দেন ইমরান খান। বিস্ফোরক দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, পুলওয়ামার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটবে। ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতারা যতই প্রতিবাদ করুক না কেন দলের অন্দরে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে পড়েছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
এদিন ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গটন বিল নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভা। রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী সরকার পক্ষের কাছে জানতে চান জম্মু ও কাশ্মীর ভারত এবং পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক বিষয়। ভারত সরকার কি করে নিজের ইচ্ছাতেই এই বিষয়ে প্রস্তাব ও বিল পাশ করার সিদ্ধান্ত নিল। এছাড়া ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর বিষয়টি রাষ্ট্রসঙ্ঘে বিচারাধীন। সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে দিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর কথা না ভেবে কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে।
এর জবাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং আকসাই চিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরও জম্মু ও কাশ্মীরের সীমানার মধ্যেই পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অযথা কংগ্রেস কেন প্রশ্ন করছে। কাশ্মীরের জন্য নিজের জীবনের বলিদান দিতে প্রস্তুত আমরা। জম্মু ও কাশ্মীর বর্তমানে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে। ফলে সংসদের অধিকার রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে আইন প্রণয়ন করা। আইন প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে কেউ আমাদের রুখতে পারবে না। যে বিল এবং প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে তা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
লাদাখকে পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করানোর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অমিত শাহ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে লাদাখবাসীর এই দাবি ছিল। সেটাই পূরণ করা হয়েছে। লাদাখের মধ্যে আকসাই চিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পার্বত্য পরিষদ নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে যাবে। কোনওভাবেই তাদের অধিকার খর্ব করা হবে না । জম্মু ও কাশ্মীরে বিধানসভা এবং নির্বাচিত সরকার থাকবে।
উল্লেখ, করা যেতে পারে রাজ্যসভায় সোমবার ৩৭০ ধারা অবলুপ্তি প্রস্তাব গৃহীত হয়। পাশাপাশি ভোটাভুটি পাশ হয় জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯। মঙ্গলবার এই বিষয়ে লোকসভায় আলোচনা হয়। এদিন জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ (দ্বিতীয় সংশোধন) ২০১৯ বিল পেশ করা হয়।
জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির প্রস্তাব পাশ হয়ে যায় লোকসভায়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৩৫১ এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৭২টি।
ভোটাভুটির আগে অমিত শাহ বলেন, পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুই কাশ্মীরের বিষয়টি রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিয়ে গিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না ভুল তা ইতিহাস ঠিক করবে। কিন্তু যখনই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে নরেন্দ্র মোদীকে মানুষ স্মরণ করবে। আইনশৃঙ্খলা অবনতির কারণে কার্ফু জারি করা হয়নি। পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ পর্যায় না চলে যায় তাই কার্ফু জারি করা হয়েছে। আসাদউদ্দিন ওয়েইসিকে কটাক্ষ করে অমিত শাহ জানিয়েছেন, ওয়েইসি বলেছেন যে আমরা ঐতিহাসিক ভুল করতে চলেছি। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিক ভুলের সংশোধন করতে চলেছি। গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে যে উন্নয়ন হয়েছে তা থেকে মানুষ বুঝতে পেরেছে উপত্যকার উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় ৩৭০ ধারা।
লোকসভায় পাশ হয়ে গেল জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ৩৭০ এবং বিপক্ষে ৭০টি ভোট পড়ে।
সোমবার রাজ্যসভায় কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল পাশ হয় রাজ্যসভায়। প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সংসদের উভয় কক্ষে বিলটি পাশ হওয়ার ফলে এখন তা পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির কাছে সই করানোর জন্য। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ সই করলে বিলটি আইনে পরিণত হবে।
পুলওয়ামার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটবে। মঙ্গলবার এমনই বিস্ফোরক দাবি করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
এদিন ইসলামাবাদে যৌথ সংসদীয় অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইমরান খান দাবি করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তারা (ভারত) কাশ্মীরিদের কোণঠাসা করতে চাইছে। ফলে পুলওয়ামার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে। এরপর নিজের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ইমরান খান দাবি করেন, পুলওয়ামা হামলায় পাকিস্তানের কোনও হাত ছিল না। ফের যদি এমন ঘটনা ঘটে তবে পাকিস্তানকে দায়ী করা অনুচিত হবে। তারা (ভারত) হামলা চালাতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানও জবাব দেবে। ভারতের এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে তারা কথা বলতে চায় না।
৩৭০ ধারা অবলুপ্তির বিরুদ্ধে যখন নিন্দায় সরব হচ্ছেন গুলাম নবি আজাদ, রাহুল গান্ধী, অধীররঞ্জন চৌধুরীর মতো নেতারা তখন অপর দিকে ৩৭০ ধারা অবলুপ্তিকে স্বাগত জানিয়ে কংগ্রেসের অন্দরেই এগিয়ে এলেন জর্নাধন দ্বিবেদী, মিলিন্দ দেওরা, দীপেন্দ্র হুডা, অদিতি সিং-এর মতো নেতা-নেত্রীরা।
৩৭০ ধারা অবলুপ্তিকে স্বাগত জানিয়ে বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা জর্নাধন দ্বিবেদী জানিয়েছেন, দেরি করে হলেও ঐতিহাসিক ভুল অবশেষে সংশোধন করা গিয়েছে। এটাই রাষ্ট্রের পক্ষে সন্তোষের বিষয়। স্বাধীনতার পর বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী চাইতেন ৩৭০ ধারা থাক। এমনকি রাম মনোর লোহিয়াও ৩৭০ ধারার বিলুপ্তি চাইছেন। দীপেন্দ্র হুডা ৩৭০ ধারা অবলুপ্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার স্বার্থে এটি করা হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে এর কোনও স্থান নেই। জম্মু ও কাশ্মীর সর্বোপরি গোটা দেশের স্বার্থে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুম্বইয়ের দাপুটে কংগ্রেস নেতা মিলিন্দ দেওরা বলেন, ৩৭০ ধারা নিয়ে যে উদারপন্থী বনাম রক্ষণশীলদের বিতর্কে যে পরিণত হয়েছে তাদ দুঃখজনক। জম্মু ও কাশ্মীরের শান্তি এবং উন্নয়নের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সরিয়ে রেখে ভারতের একতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় নিয়ে আলোচনা করা হোক। জম্মু ও কাশ্মীরে শান্তি, কাশ্মীরি যুবকদের জন্য চাকরি এবং কাশ্মীরি পণ্ডিত জন্য ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক।
উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলির সদরের কংগ্রেস বিধায়ক অদিতি সিং জানিয়েছেন, ৩৭০ ধারা অবলুপ্তিতে পূর্ণ সমর্থন। ভারতের মূল ধারার সঙ্গে আরও বেশি করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে জম্মু ও কাশ্মীর। এটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। অযথা বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। বিধায়ক হিসেবে বিষয়টি স্বাগত জানাচ্ছি।

