নয়াদিল্লি, ২০ আগস্ট (আইএএনএস): ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হওয়ার মধ্যেই বৃহস্পতিবার কংগ্রেস তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের পক্ষে সওয়াল করে জানিয়েছে, দলীয় কর্মসূচিতে জাতীয় সংগীতের প্রথম দুই স্তবকই গাওয়ার ঐতিহ্য বজায় থাকবে। নিজেদের অবস্থানের ঐতিহাসিক ও জাতীয়তাবাদী ভিত্তি তুলে ধরতে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গও টেনেছে কংগ্রেস। এ নিয়ে বিজেপির তীব্র সমালোচনার মুখে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি কোনও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়।
কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার প্রথা চলে আসছে। তাঁদের দাবি, ব্রিটিশ শাসনের সময় নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মুখেও কংগ্রেস কর্মীরা ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বন্ধ করেননি। একইসঙ্গে জনসংঘ ও আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে ব্রিটিশদের কাছে তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এর আগে বুধবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (সিডব্লিউসি) ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় কর্মসূচিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার প্রথা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার সরকারি প্রোটোকলের অংশ হিসেবে জাতীয় সংগীতটির সম্পূর্ণ সংস্করণ গাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কংগ্রেস সাংসদ জেবি মেথার বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় একাধিক বিশিষ্ট নেতার আলোচনার পরই দলের এই অবস্থান নির্ধারিত হয়েছিল এবং সেই প্রথা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে।
আইএএনএস-কে মেথার বলেন, “বন্দে মাতরম নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান আজ, গতকাল বা তার আগের দিনের সিদ্ধান্ত নয়। এটি ১৯৩৭ সালের কলকাতা অধিবেশন থেকে চলে আসছে। সেই সময় মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মহান নেতারা একত্রিত হয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এরপর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় যে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সেই সিদ্ধান্ত আজও বহাল রয়েছে এবং চিরকাল বহাল থাকবে।”
কংগ্রেসের মুখপাত্র সুরেন্দ্র রাজপুতও ‘বন্দে মাতরম’-এর সঙ্গে দলের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু থেকেই কংগ্রেস কর্মীরা জাতীয় সংগীতটি গেয়ে আসছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রাজপুত বলেন, “আমরা শুরু থেকেই ‘বন্দে মাতরম’ গেয়ে আসছি। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আমরা যখন ‘বন্দে মাতরম’ গাইতাম, তখন ব্রিটিশদের তোষামোদকারী জনসংঘ ও সংঘের লোকেরা ব্রিটিশদের জানাত যে অমুক স্বাধীনতা সংগ্রামী ‘বন্দে মাতরম’ গাইছেন। এরপর ব্রিটিশরা আমাদের পিঠে চাবুক মারত।”
তিনি আরও বলেন, “তখনও আমরা ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বন্ধ করিনি। সেই সময় যে ‘বন্দে মাতরম’ আমরা গাইতাম, আজও সেটিই গাইছি। মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যে ‘বন্দে মাতরম’ গেয়েছেন এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গানকে অনুমোদন করেছিলেন, আমরা সেটিই গেয়েছি, গাইছি এবং ভবিষ্যতেও গেয়ে যাব।”
রাজপুত আরও প্রশ্ন তোলেন, “সংঘের লোকেরা তাদের শাখায় কখনও ‘বন্দে মাতরম’ কেন গাইত না?” বিজেপির সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা বিজেপির হাতে চাবুক খেতেও প্রস্তুত, কিন্তু শুধু এর কারণটা জানতে চাই।”
এদিকে রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির (আরএসপি) সাংসদ এন. কে. প্রেমচন্দ্রন বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া জোটের অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর মতে, জাতীয় সংগীতের উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা নয়, বরং ঐক্য গড়ে তোলা।
প্রেমচন্দ্রন বলেন, “বন্দে মাতরমের বিষয়ে কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া জোটের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। জাতীয় সংগীত মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য নয়, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য।”
কংগ্রেসের এই সাফাই এমন সময়ে সামনে এল, যখন ‘বন্দে মাতরম’-এর মাত্র দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিজেপি দলটির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে। বিজেপির অভিযোগ, সম্পূর্ণ জাতীয় সংগীত না গেয়ে দুই স্তবকে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে।
–আইএএনএস



















