আগরতলা ১৩ মার্চ : ত্রয়োদশ ত্রিপুরা বিধানসভার অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেনের প্রয়াণে আজ বিধানসভায় শোক ও স্মৃতিচারণ করা হয়েছে। শোকবার্তায় বলা হয়েছে, তাঁর মৃত্যুতে ত্রিপুরা বিধানসভা হারাল এক প্রজ্ঞাবান অভিভাবক, অভিজ্ঞ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং নিবেদিতপ্রাণ জননেতাকে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
শোকবার্তায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, গত ৮ আগস্ট ২০২৫ সালে বিধানসভায় দিনের কাজ সম্পন্ন করে ধর্মনগরে নিজ বাসভবনে ফেরার পথে আগরতলা রেলস্টেশনে তিনি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতা শনাক্ত করেন এবং জরুরি চিকিৎসা শুরু করেন। পরে পরিবারের ইচ্ছানুসারে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাঁকে বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোররাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৫৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ধর্মনগরে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্ববন্ধু সেন। সেখানেই তাঁর বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মেধাবী, সংবেদনশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নেতৃত্ব ও সমাজ সচেতনতার পরিচয় দেন। আগরতলার এম.বি.বি. কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।
১৯৭০-এর দশক থেকে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। গরিব, অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কর্মহীন যুবসমাজের পাশে দাঁড়াতে তিনি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন। ধর্মনগরসহ অবিভক্ত উত্তর জেলায় জনগণের প্রশাসনিক সুবিধা ও সংবিধানসম্মত অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
২০০৮ ও ২০১৩ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে ৫৬-ধর্মনগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন। পরে ২০১৭ সালে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন এবং ২০১৮ ও ২০২৩ সালে একই কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে পুনরায় জনগণের আস্থা অর্জন করেন।
২০১৮ সালে ত্রিপুরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ২১ জুন ২০১৮ থেকে দ্বাদশ বিধানসভার পূর্ণ মেয়াদকাল পর্যন্ত তিনি উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় বিধানসভার অধিবেশন পরিচালনায় তাঁর বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও দক্ষতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। ত্রয়োদশ বিধানসভা গঠনের পর তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হন এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নিরপেক্ষতা রক্ষা ও সদস্যদের ন্যায়সংগত সুযোগ প্রদান করার ক্ষেত্রে তিনি এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতি জগতের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত বিশ্ববন্ধু সেন নাটক ও যাত্রাপালার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। নিজেও বিভিন্ন সময়ে নাট্য ও যাত্রা অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছেন এবং রাজ্যে নাট্য ও যাত্রাচর্চাকে এগিয়ে নিতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। পাশাপাশি ছড়া ও কবিতা লেখার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল।
সৌজন্য, সহনশীলতা ও শালীন আচরণের জন্য তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর প্রয়াণে ত্রিপুরা বিধানসভা হারাল এক দক্ষ পথপ্রদর্শক, নিরপেক্ষ অভিভাবক এবং মানবিক নেতৃত্বকে।
এই শোকাবহ মুহূর্তে ত্রিপুরা বিধানসভা প্রয়াত বিশ্ববন্ধু সেনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।

