‘ভারতের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করেছে সরকার’, অভিযোগ তুলে লোকসভায় রাহুল গান্ধীর তীব্র আক্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি, ১১ ফেব্রুয়ারি : কেন্দ্র সরকার “ভারতের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দিয়েছে” বলে অভিযোগ তুলে বুধবার লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, ভারত–মার্কিন বাণিজ্য কাঠামোর অধীনে দেশ তার কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বারবার প্রতিবাদ, অধ্যক্ষের হস্তক্ষেপ এবং সংসদে তুমুল হট্টগোল দেখা যায়।

কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর বিতর্ক শুরু করে রাহুল গান্ধী বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে “চাপে” মনে হচ্ছে এবং তিনি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করেছেন। তিনি বলেন, পিএম কি আঁখ মে ডর দিখতা হ্যায়। আপনি ইন্ডিয়াকে বেচ দিয়া, ভারত মাতাকে বেচ দিয়া।

রাহুলের দাবি, বিশ্ব এখন এক অস্থির পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে জ্বালানি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অর্থনৈতিক সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থা একমেরু মার্কিন আধিপত্য থেকে সরে বহুমেরুকেন্দ্রিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে চীন ও রাশিয়ার উত্থান নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বলেন রাহুল। তাঁর আশঙ্কা, এআই ভারতের সফটওয়্যার ও পরিষেবা খাতে বড় ধাক্কা দিতে পারে এবং ইনফোসিস-সহ বিভিন্ন সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের তৈরি বিপুল ডেটাই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু ডেটা ও জ্বালানির উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এআই-তে নেতৃত্বের দাবি অর্থহীন।

ডেটা ও এনার্জির নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এআই নিয়ে কথা বলা মানে জ্বালানি ছাড়া ইঞ্জিনের কথা বলা, মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, বাজেটে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার উল্লেখ থাকলেও সুরক্ষার কোনও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই।

ভারত–মার্কিন চুক্তি প্রসঙ্গে রাহুল অভিযোগ করেন, সরকার অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে। তাঁর দাবি, ডিজিটাল বাণিজ্য সুরক্ষা শিথিল করা হয়েছে, ডেটা লোকালাইজেশনের শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় ডেটা অবাধ প্রবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ডিজিটাল কর কমানো হয়েছে এবং সোর্স কোড প্রকাশ সংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।

শুল্ক কাঠামোতেও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, মার্কিন পণ্য ভারতে সুবিধাজনক শর্তে প্রবেশ করছে, অথচ ভারতীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হরিয়ানার বস্ত্র শিল্পের মালিকদের সঙ্গে কথোপকথনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবর্তিত শুল্ক নীতির কারণে তারা সমস্যায় পড়েছেন। একইসঙ্গে, মার্কিন রপ্তানি দ্রুত বাড়তে পারে, কিন্তু তার বিনিময়ে সমান প্রতিশ্রুতি নেই বলেও অভিযোগ করেন।

জ্বালানি খাতে তিনি দাবি করেন, ভারতের তেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত কার্যত মার্কিন নজরদারির আওতায় চলে যেতে পারে। নির্দিষ্ট শর্ত না মানলে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের আশঙ্কার কথাও তোলেন তিনি। “ওরা আমাদের নজরদারি করবে,” বলে এটিকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ক্ষতি বলে অভিহিত করেন রাহুল।

বাজেট বিতর্কের সঙ্গে আদানি গোষ্ঠী সম্পর্কিত মার্কিন মামলার প্রসঙ্গও টানেন তিনি। তাঁর দাবি, বিষয়টি বিজেপির আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আদানি সাধারণ ব্যবসায়ী নন। কর্পোরেট স্বার্থে বাজেট প্রভাবিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন।

কৃষিক্ষেত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে রাহুল বলেন, যান্ত্রিকীকৃত মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাজার খুলে দিলে ভুট্টা, সয়াবিন ও তুলা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এর আগে কোনও প্রধানমন্ত্রী এমনটা করেননি, মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, রাহুল গান্ধী বিদেশে চলমান একটি তদন্তের সঙ্গে যুক্ত তথাকথিত নথির উল্লেখ করলে নতুন করে হট্টগোল শুরু হয়। তিনি দাবি করেন, কয়েকজন ভারতীয় ব্যক্তির নাম সেখানে রয়েছে। স্পিকার তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করে বলেন, যাচাইবিহীন অভিযোগ সংসদের নথিতে তোলা যাবে না এবং পূর্ব নোটিস ছাড়া কোনও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন।

Leave a Reply