ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, উদ্বোধন করলেন নতুন অডিটোরিয়াম

বালেশ্বর, ৩ ফেব্রুয়ারী : রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু মঙ্গলবার ওডিশার বালেশ্বর জেলার ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত অডিটোরিয়ামের উদ্বোধন করেন।

সমাবর্তন ভাষণে রাষ্ট্রপতি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং সামাজিক রূপান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর মতে, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানমুখী গবেষণার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজের অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে হবে।

প্রখ্যাত ওড়িয়া সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক ব্যাসকবি ফকির মোহন সেনাপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ছাত্রীজীবনে তাঁর বিখ্যাত গল্প রেবতী তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে এক কিশোরীর শিক্ষালাভের সংকল্পকে কেন্দ্র করে রচিত এই গল্প তাঁর মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল বলে জানান তিনি। নিজের জীবনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি এক প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে পড়াশোনা শুরু করে পরে ভুবনেশ্বরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন—ফকির মোহন সেনাপতির জীবন ও রচনাই তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, মাতৃভাষায় পড়াশোনা করলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সভ্যতাগত মূল্যবোধ ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

ভারতের সমৃদ্ধ জ্ঞান-ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রাচীন শাস্ত্র ও পাণ্ডুলিপিতে সাহিত্য, কবিতা ছাড়াও বিজ্ঞান, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যবিদ্যার মতো নানা ক্ষেত্রে অমূল্য জ্ঞান সঞ্চিত রয়েছে। তিনি তরুণদের এসব ক্ষেত্রে গবেষণায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, অতীতকে বোঝা ও বর্তমানকে অনুধাবন করেই একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব।

স্নাতক শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, জ্ঞান, উদ্দীপনা ও অঙ্গীকার তাঁদের সমাজে সম্মান এনে দেবে। তিনি পরামর্শ দেন, সফল জীবন গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থবহ জীবন আরও বেশি মূল্যবান। পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন।

ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও সম্প্রসারণমূলক কর্মসূচির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বালেশ্বর-ভদ্রক অঞ্চল ধান চাষ, পান বরজ ও মৎস্যচাষের জন্য পরিচিত—এই ক্ষেত্রগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রশংসনীয়। ‘ব্যাক টু স্কুল’, ‘আর্ন হোয়াইল লার্ন’, ‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’ এবং পরিবেশ সচেতনতা ও সমুদ্রতট পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মতো উদ্যোগগুলিকেও তিনি সাধুবাদ জানান।

উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এমন নীল কাঁকড়া ও হর্সশু কাঁকড়া নিয়ে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরদর্শিতার পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

ভাষণের শেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের অগ্রগতির জন্য সমাজের সব অংশের বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অপরিহার্য। ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও মূল্যনির্ভর ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply