আগরতলা, ৪ জানুয়ারি: বিশ্ববন্ধু সেনের প্রয়াণে ত্রিপুরার মানুষ সত্যিকার অর্থে একজন জননেতা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে। বরাবরই বিধানসভায় তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। আজ আগরতলার নজরুল কলাক্ষেত্রে ত্রিপুরা বিধানসভার সদ্য প্রয়াত অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেনের স্মৃতিচারণ সভায় একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
স্মৃতিচারণ সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, দেওয়ালের মধ্যে ঝুলে থাকা ছবিতে মালা লাগলে গত হয়ে যান। আজকের এমনই এক মুহূর্তে প্রয়াত বিশ্ব বন্ধু সেনের ছবিতে আমরা ফুলমালা দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। প্রত্যেকের জীবনে এটা আসবে একদিন। মৃত্যুটা একমাত্র সত্যি, আর কোন সত্য নেই। কিন্তু আমরা সেই সত্যকে মানতে চাই না। আমরা একবারও ভাবি না যে মৃত্যু অবধারিত। এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যে তিনি মারা গেলে স্মৃতিচারণা করে শেষ করা যাবে না। কাজেই প্রতিটি ব্যক্তির এমন কাজ করা উচিত যার স্মৃতিচারণা করতে হলে যাতে শেষ করা যায় না। এমনই একজন ব্যক্তি বিশ্ব বন্ধু সেন।
স্মৃতিচারণায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে যখন এমবিবি কলেজে সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করি সেসময় বিশ্ব বন্ধু সেনও সেখানে পড়াশুনা করতেন। প্রায় সময় দুজনের কথাবার্তা হতো। এরআগেও ধর্মনগরে বিভিন্ন কাজে গেলে তাঁর সঙ্গে কথা হতো। ওই সময়ে এমন একটা পরিস্থিতি ছিল যেখানে খুন, সন্ত্রাস, বোমাবাজি ইত্যাদি ঘটনা লেগে থাকতো। এমবিবি কলেজে তো পড়াশুনার অবস্থাই ছিল না। কলেজে পড়ার সময় বিশ্ব বন্ধু হোস্টেলে থাকতেন। আমাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তখনকার সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কলেজ জীবন, বাম শাসন ইত্যাদি বিষয় নিয়েও এদিন স্মৃতিচারণ করেন ডাঃ সাহা।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদানের পর আমাকে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কাজের সুত্রে আমাকে ধর্মনগর যেতে হতো। সেসময় ধর্মনগরের বিধায়ক বিশ্ব বন্ধু সেন। তাঁর কাছে গেলে সকলের কাছে আমাকে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দিতেন। আগরতলা থেকে আমরা ধর্মনগর গেলে অন্যতম ভরসার মানুষ হিসেবে তাকেই পেতাম। গাড়িতে চেপে বা ট্রেনে আমাকে বহুবার সেখানে যেতে হয়েছে। বরাবরই তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন এবং গুরুত্ব সহকারে আমাদের সব কথাবার্তা শুনতেন। পরবর্তী সময়ে আমি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার নিই এবং তিনি বিধানসভার অধ্যক্ষ হন। আর আগরতলায় যখনই আসেন সবসময় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। সেই সঙ্গে এক কাপ চায়ের আবদার করতেন। আমিও তাঁকে যথাযথ সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
সভায় মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, গত ৮ আগস্ট শেষবারের মতো আমার কাছে গিয়ে লিকার চা খেয়ে আসেন। তিনি ধর্মনগরকে নিয়ে সবসময় চিন্তা করতেন। পরবর্তী সময়ে আমার কাছে হঠাৎ করে খবর আসে বিশ্ব বন্ধু সেন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাঁকে প্রথমে ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে গ্রিন করিডোর করে আমার এসকর্ট সহযোগে আইএলএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের কথামতো উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। যদিও জীবন যুদ্ধে শেষপর্যন্ত হার মানতে হয় তাঁকে। কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করে গিয়েছেন তিনি। বিধানসভার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির প্রদেশ সভাপতি তথা সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, সহ সভাপতি সুবল ভৌমিক, পাপিয়া দত্ত, তাপস ভট্টাচার্য, বিধানসভার উপাধ্যক্ষ রাম প্রসাদ পাল, প্রাক্তন অধ্যক্ষ তথা বিধায়ক রতন চক্রবর্তী, মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, টিংকু রায়, কিশোর বর্মন, আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, মুখ্য সচেতক কল্যানী সাহা রায় সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। এর পাশাপাশি ভারতীয় জনতা পার্টির মন্ডল ও জেলা স্তরের নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন।
2026-01-04

