বিশালগড়ে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তর

নিজস্ব প্রতিনিধি, চড়িলাম, ২০ এপ্রিল:
ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিশালগড়ে কৃষকেরা একই সঙ্গে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করছেন। এছাড়া যেসব জমি কখনও চাষ করা হয়নি, এসব জমিতে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।

সিপাহীজলা জেলার বিশালগড় কৃষি মহকুমার অধীনে বিশালগড় কৃষি সেক্টরের উদ্যোগে ত্রিপুরা কৃষি মহাবিদ্যালয় ও ভারতীয় ডাল গবেষনা কেন্দ্র কানপুর, উত্তরপ্রদেশ এর সহযোগিতায় এই প্রান্তিক কৃষকদের জমি তৈরির সাহায্য , বীজ , সার , জৈব সার জীবাণু সার, জৈব কীটনাশক প্রদান, পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা ও সরকারি উৎসাহ প্রদান করে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করে সবজি , ডাল সরিষা ও বিভিন্ন জাতের ধান করা হচ্ছে।

সরেজমিনে বিশালগড়ে রঘুনাথপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা আমন ধানের পর প্রায় ১০০ কানি জমি কোনো চাষ করতে পারতো না সেই জমিতে রবি মৌসুমে সরিষা চাষ ও গ্রীষ্ম কালীন মুগ, মাশ কলাই ডাল করে এক ফসল জমিকে তিন ফসলী জমিতে রূপান্তর করেছে। কৃষিতে খরচ বাড়লেও সারা বছর দপ্তর থেকে আর্থিক সহায়তায় প্রদান করার ফলে পতিত জমিসহ সব জমিতে চাষ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বিশালগড় কৃষি ও উদ্যান মহকুমায় কৃষি ও উদ্যান মিলিয়ে ১০ হাজারের উপর কৃষকের একাউন্টে সরাসরি আর্থিক সহায়তায় প্রদান করা হয়েছে।
কৃষক রুস্তম মিয়া বলেন, আমি গত তিন বছর ধরে আমার ৩ কানি জমিতে আমন মৌসুমে ধান চাষ করতাম। এ জমি গুলো কয়েক বছর আগেও বাকি মৌসুমে পতিত ছিল। এখন সরিষা , ডাল , গম, অসময়ে ফুল কফি বাধা কফি চাষ করছি।

কৃষক মনীষ দেব বলেন, আমি আগে আমার জমিতে শুধু আমন ধান চাষ করতাম। আমন চাষ করে আমার পরিবারের খাদ্যের চাহিদায় ঘাটতি থাকতো। পরে একই জমিতে গত বছর থেকে শীত কালে সরিষা ও গ্রীষ্ম কালীন ডাল চাষ ও কিছু জমিতে ফুল চাষ করছি। তিনি আরো জানান এই গ্রামে কৃষকদের জল সেচের পাম্প , স্প্রে মেশিন , প্রশিক্ষন কর্মশালা আয়োজন করছে কৃষি বিভাগ ত্রিপুরা সরকার। মোট ২১০০০ টাকার সরিষা বিক্রি করেছি, ডালের ফলন ভালো হবে বলে আশা করি।
লক্ষীবিল গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক দশক আগেও আমন মৌসুমের পর বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পড়ে থাকত অনাবাদি। কিন্তু এখন দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে। এসব জমিতে আমনের পরেই ফলছে বোরো, তিল সহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, উন্নত চাষ পদ্ধতি, জৈব কীটনাশক ও সারের ব্যবহার , উন্নত কীটনাশক ও উন্নত জাতের বীজের কারণে এলাকার এক সময়ের এক ফসলি জমি পরিণত হচ্ছে দুই ও তিন ফসলি জমিতে। আত্মা প্রকল্পের অধীনে আর্থিক সহায়তায় ভালো বীজ প্রদান করা হচ্ছে । মোট ৩০ কানি জমিতে তিল চাষ হচ্ছে এই গ্রামের পতিত জমিতে।
মধ্য লক্ষীবিল গ্রামের কৃষক বাদল রায় বলেন, ‘আমন ধানের পরে জমি পতিত থাকতো। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় সেই জমিতে মোট ১৬ জন কৃষক ২০ কানি জমিতে কাউন চাষ করছে। এখন ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায়।
চম্পামুড়া গ্রামের কৃষক মানিক লস্কর বলেন, ‘ধান চাষ করে বছরের খোরাগ ব্যবস্থা হতো । ত্রিপুরা কৃষি মহাবিদ্যালয় ও কৃষি বিভাগের এর সহযোগিতায় এখন ধানের পাশাপাশি বারো মাস সবজি চাষ , ফুল পেঁয়াজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা এমনটাই জানা গেছে ।মোট ১৬ জন কৃষক চম্পামুড়া গ্রামে ২ হেক্টর জমিতে প্রথম বারের মত ফুল চাষ করেছে কৃষি ও উদ্যান বিভাগ থেকে প্রশিক্ষন, আর্থিক সাহায্য পেয়ে।
গকুলনগর গ্রামের কৃষকঃ হরিসাধন রায় বলেন, ‘বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে খাল-ডোবা-পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় জলের অভাব দেখা দেয়। কৃষি আধিকারিকের পরামর্শ অনুযায়ী কাউন চাষ করেছি যাতে জলের প্রয়োজন কম ও ভালো বাজারমূল্য আশা করছি।
কৃষি কর্মকর্তা এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ওনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের অনেক পতিত জমি চাষের আওতায় এসেছে। পর্যাপ্ত সেচ থাকলে আরও পতিত জমি চাষের আওতায় আসবে। সেচ দপ্তর ডি টি ডাব্লিউ, কৃষি বিভাগ পুকুর , পাম্প মেশিন প্রদান করছে। বিভিন্ন মোটর চালিত সেচ ব্যবস্থা অর্থাৎ লিফট ইরিগেশন মেরামত করা হচ্ছে। কৃষকরা পতিত জমিতে সরিষা, ডাল , কাউন , তিল সহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আত্মা প্রকল্প, আর কে ভি ওয়াই, ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি মিশন, ফুড অ্যান্ড নিউট্রি সিরিয়েল , কৃষি সিঞ্চাই যোজনা, রাজ্য পরিকল্পনা কৃষি ও উদ্যান , এম আই ডি এইচ প্রকল্পের অধীনে আর্থিক সহায়তায় প্রদান ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।
পাল্টে বিশালগড় এলাকার আবাদি জমির চিত্র। ধীরে ধীরে কমছে অনাবাদি, পতিত জমি। প্রায় সব জমি আসছে চাষের আওতায়। পরিণত হচ্ছে তিন ফসলি জমিতে। প্রশিক্ষণ আর পৃষ্ঠপোষকতা এই ভাবে বজায় থাকলে এসব জমির ফসলের উৎপাদন বাড়বে। এতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে কৃষক। সমৃদ্ধ হবে কৃষি অর্থনীতি।

———-