বর্তমান রাজ্য সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া: মুখ্যমন্ত্রী

আগরতলা, ৫ মার্চ: বর্তমান রাজ্য সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মান সম্পন্ন আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত পরিকাঠামো এবং দক্ষ মানব সম্পদের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে। আজ এ.জি.এম.সি. ও জি.বি.পি. হাসপাতালে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরিষেবার সূচনা করে এ.জি.এম.সি কাউন্সিল ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, এ.জি.এম.সি. ও জি.বি.পি. হাসপাতালে আজ যে তিনটি স্বাস্থ্য পরিষেবার সূচনা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ১৬ শয্যা বিশিষ্ট রেসপিরেটরি অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ট্রমা সেন্টার অপারেশন থিয়েটার এবং নবনির্মিত লেবার রুম কাম ও.বি.এস. অ্যান্ড গাইনো ও.টি. কমপ্লেক্স। তিনি বলেন, এই পরিষেবাগুলি চালু হওয়ার ফলে রোগীদের উন্নত ও সময়োপযোগী চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা আরও সহজ হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম সম্বলিত রেসপিরেটরি ও জেরিয়াট্রিক আই.সি.ইউ. চালু হওয়ার ফলে শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা এবং বার্ধক্যজনিত গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এই পরিষেবা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে ৩২০টির উপর আইসিইউ-এর শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হবে। দ্বিতীয় পরিষেবা প্রসঙ্গে জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ট্রমা সেন্টারের অপারেশন থিয়েটার চালু করা স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে এখন থেকে ২৪ ঘন্টা জরুরি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হবে। এখানে রোগীদের নিউরো সার্জন, জেনারেল সার্জন এবং অর্থোপেডিক সার্জন সহ বিভিন্ন ট্রমা বিশেষজ্ঞদের পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

নবনির্মিত লেবার রুম কাম ও.বি.এস. অ্যান্ড গাইনো ও.টি. কমপ্লেক্স সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মা এবং নবজাতকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রসূতি মা ও নবজাতকের জন্য উন্নত নিরাপদ চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ.জি.এম.সি. ও জি.বি.পি. হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৭২৭ থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ১,৪১৩টি করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক, কমিউনিকেবল ডিজিজ সেন্টার এবং বিশেষ ওয়ার্ড নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে এইমসের সাথে টেলি মেডিসিনের মাধ্যমে বিভিন্ন চিকিৎসা পরিষেবার বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করার সুযোগ চালু করা হয়েছে। সুপার স্পেশালিটি বিভাগে সুযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা এখন রাজ্যেই সম্ভব হচ্ছে। এরফলে রোগীদের বাইরে চিকিৎসা করানোর প্রবণতাও অনেক হ্রাস পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজ্যে চিকিৎসা শিক্ষার পরিধিও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ১১৯টি করা হয়েছে। পাশাপাশি মহকুমাস্তরের, জেলাস্তরের হাসাপাতাল, ডেন্টাল কলেজ সহ অন্যান্য চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নতি করা হচ্ছে। মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারছেন।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্যে ইতিমধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপন করার কাজ শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে লিভার ও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার রাজ্যে ‘ত্রিপুরা হেলথ ইউনিভার্সিটি’ স্থাপনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। চিকিৎসক এবং নার্সদের দক্ষতা উন্নয়নের স্বার্থে ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে নতুন দিল্লিস্থিত এইমসে তিন মাসের প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এই প্রশিক্ষণপর্ব চলবে। মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন সফলতার চিত্র যেমন, সিপাহীজলা এবং খোয়াইয়ে নতুন জেলা হাসপাতাল স্থাপন, রাজ্যে হোমিও ও আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল স্থাপন, কুলাইস্থিত ধলাই জেলা হাসপাতালে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব নেওয়া, ভারত মাতা ক্যান্টিন চালু করা, আরও নতুন ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালুর উদ্যোগ, বিশ্রামগঞ্জে নেশামুক্তি কেন্দ্র স্থাপন, ১০০ শয্যা বিশিষ্ট টার্শিয়ারি আইকেয়ার হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা, মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য যোজনায় নন-কমিউনিকেবল রোগের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় এবং মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ প্রদান ইত্যাদি বিষয়ের উপরও আলোকপাত করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্যের চিকিৎসা কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাঁপানিয়াস্থিত পুরোনো জুটমিলের স্থানে একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য নীতিগতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রাজ্যে একটি ইএসআই, হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জি.বি.পি. হাসপাতাল রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আগামীতে এর আরও উন্নয়নে ও সৌন্দর্য্য বর্ধনেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাংবাদিক সম্মেলনের আগে মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব, স্বাস্থ্য অধিকর্তা সহ অন্যান্য আধিকারিকগণ আজকের তিনটি পরিষেবার সূচনা করেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জি.বি-র রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারপার্সন বিধায়ক মিনা রাণী সরকার, স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিতো, এ.জি.এম.সি.-র অধ্যক্ষ ডা. তপন মজুমদার, জি.বি. হাসপাতালের এম.এস. ডা. বিধান গোস্বামী প্রমুখ।

Leave a Reply