আগরতলা, ৫ মার্চ: রাজ্যে বিদ্যুৎ চুরি এবং হুক লাইনের মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে এবার কার্যত জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (টিএসইসিএল)। বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বিদ্যুৎ চোরদের কোনও ভাবেই রেয়াত করা হবে না। আইনানুগ সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাজ্য থেকে বিদ্যুৎ চুরি রুখে দেওয়ার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন নিগমকে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুৎ চুরি শুধু সরকারের আর্থিক ক্ষতিই ডেকে আনে না, বরং এর ফলে বৈধ গ্রাহকদের পরিষেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিদ্যুৎ চুরি রোধ করতে নিগমের ভিজিল্যান্স দলকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদেরও এই অভিযানে এগিয়ে এসে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, মন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী গোটা রাজ্যে ভিজিল্যান্স কার্যক্রম ইতিমধ্যেই জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালিয়ে অবৈধ হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ চোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, গত কয়েক বছরে নিগমের ভিজিল্যান্স উইং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে শুধু হাজার হাজার হুক লাইন বিচ্ছিন্নই করেনি, বরং জরিমানা হিসেবে রাজ্যের কোষাগারে
উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা করেছে।
নিগমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষ থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজ্যে মোট ৫৪ হাজার ৬০৪টি অবৈধ হুক লাইন এবং বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই আট বছরে বিদ্যুৎ চোরদের বিরুদ্ধে মোট ১৪ কোটি ১৬ লক্ষ টাকার বেশি জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ১১ কোটি ২১ লক্ষ টাকারও বেশি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে নিগম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই অর্থবর্ষে এই অভিযানের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার ফলেই জরিমানা আদায়ের পরিমাণও অনেক বেড়েছে।
নিগমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ৯৬৫২টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। সেই বছর জরিমানা ধার্য করা হয় ৯৩ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা, যার মধ্যে আদায় করা হয় ৮১ লক্ষ ৩১ হাজার টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭ হাজার ১১৯টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জরিমানা ধার্য করা হয় ৭১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, যার মধ্যে ৬২ লক্ষ ২৯ হাজার টাকা আদায় করা সম্ভব হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৩টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। সেই সময় জরিমানা ধার্য করা হয়েছিল ৭৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা এবং আদায় করা হয় ৬৩ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৫টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করে ৬০ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়, যার মধ্যে আদায় করা হয় ৪৬ লক্ষ ২২ হাজার টাকা।
পরবর্তী বছরগুলিতে এই অভিযানের গতি আরও বাড়তে শুরু করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৮২টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জরিমানা ধার্য করা হয় ১ কোটি ১ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা। এর মধ্যে আদায় করা হয় ৬৬ লক্ষ ৫ হাজার টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ হাজার ১৯৬টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জরিমানা ধার্য করা হয় ২ কোটি ৬২ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভিযানের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। সেই বছরে ৯ হাজার ৯৪২টি হুক লাইন চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করা হয়। জরিমানা ধার্য করা হয় ৩ কোটি ৮৭ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা এবং আদায় করা হয় ৩ কোটি ১১ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইতিমধ্যেই ৯ হাজার ৮০৫টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জরিমানা ধার্য করা হয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা এবং আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ১৮ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা।
শুধুমাত্র চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই নিগমের ভিজিল্যান্স স্কোয়াড অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। মাসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্যুৎ সাব-ডিভিশন এলাকায় মোট ৮৩টি বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। এই অভিযানে এক মাসেই ৭৭২টি হুক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৬৪৩টি বিদ্যুৎ মিটার পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৬টি মিটারে কারচুপির ঘটনা ধরা পড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগে ৩৭ লক্ষ ৭৫ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে এবং বকেয়া সহ মোট ৩৬ লক্ষ ১৯ হাজার ৭৩১ টাকা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মভঙ্গের দায়ে ২৮৩টি বিদ্যুৎ সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা জানান, হুক লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি শুধু সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় ভোল্টেজ ওঠানামা এবং লোড শেডিংয়ের সমস্যার মুখে পড়তে হয় বৈধ গ্রাহকদের। তাই বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা গেলে রাজ্যে আরও স্থিতিশীল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
নিগমের পক্ষ থেকে আবারও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, হুকিং বা মিটারে কারচুপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যারা এখনও এই পথে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড সাধারণ মানুষের প্রতি আবেদন জানিয়েছে, তারা যেন বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করেন এবং কোথাও বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা নজরে এলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানান। বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথের কঠোর নির্দেশ এবং ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুর সক্রিয় তদারকির ফলে এই অভিযানে আরও গতি আসবে বলেই মনে করছে বিদ্যুৎ নিগম। নিগমের মতে, বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান রাজ্যে একটি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

