আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয় ও অন্তরাত্মা, স্থানীয় ভাষা সংরক্ষণ এবং হিন্দির প্রসার একসাথে চলতে হবে: মুখ্যমন্ত্রী

আগরতলা, ২০ ফেব্রুয়ারি: আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয় ও অন্তরাত্মা। আর সেই পরিচয়ের সাথে হিন্দির মেলবন্ধনই হলো বর্তমান উত্তর পূর্বাঞ্চলের মূল চেতনা এবং আধুনিক ভারতের মূল শক্তি। আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয় ও অন্তরাত্মা। আর সেই পরিচয়ের সাথে হিন্দির মেলবন্ধনই হলো বর্তমান উত্তর পূর্বাঞ্চলের মূল চেতনা এবং আধুনিক ভারতের মূল শক্তি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর উপস্থিতিতে আজ হাঁপানিয়াস্থিত আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণের ইন্ডোর হলে আয়োজিত পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং উত্তর অঞ্চলের যৌথ আঞ্চলিক রাজভাষা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।

এদিন এই সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর এই সম্মেলন আয়োজনের মূল লক্ষ্য – সরকারি ভাষা নীতির বাস্তবায়নকে আরও জোরদার করা এবং সরকারি কাজে হিন্দি ভাষা ব্যবহারে প্রেরণা ও উৎসাহিত করা।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কারণে আজ আগরতলায় রাজভাষা সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। ত্রিপুরা সরকারের পক্ষ থেকে এই কার্যক্রমে উপস্থিত সমস্ত অতিথি ও প্রতিনিধিদের মা ত্রিপুরা সুন্দরীর পূণ্যভূমিতে হার্দিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গতকাল, আমি দিল্লি থেকে ত্রিপুরায় ফিরেছি এবং আসার সময় বিমান একেবারে পরিপূর্ণ ছিল। কারণ প্রায় সকলে এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসছিলেন। আর শহরের সমস্ত হোটেল রুম সম্মেলনের জন্য বুক করা ছিল। এত বড় সম্মেলন যে এখানে হচ্ছে সেটা আমি ভাল অনুভব করেছি। এজন্য আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি তাঁর এই প্রচেষ্টার জন্য সত্যিই খুশি। এই সম্মেলন আয়োজন করার জন্য প্রশাসনের আধিকারিকগণ নিরলস কাজ করেছেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যাংকগুলিতে হিন্দি ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটা মঞ্চ হিসেবে এই রাজভাষা সম্মেলনের অসাধারণ মাহাত্ম্য রয়েছে। আজ এই কার্যক্রমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয় ও অন্তরাত্মা। আর সেই পরিচয়ের সাথে হিন্দির মেলবন্ধনই হলো বর্তমান উত্তর পূর্বাঞ্চলের মূল চেতনা এবং আধুনিক ভারতের মূল শক্তি। হিন্দি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক কথিত ভাষা। এই ভাষা সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপনের এক কার্যকর মাধ্যম। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে আজ বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটেছে। রাষ্ট্রসংঘ হোক বা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন নিজ ভাষায় বক্তব্য রেখে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভাষার মর্যাদা বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর রাষ্ট্রসংঘে দেওয়া ঐতিহাসিক হিন্দি ভাষণের স্মৃতিও রোমন্থন করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাজ্যের জনগণও হিন্দির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। ত্রিপুরার শিক্ষা ক্ষেত্রেও হিন্দির সাহিত্যচর্চা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হিন্দি ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং প্রযুক্তি বিজ্ঞান ন্যায়বিচার ও প্রশাসনের শক্ত ভিত হওয়া প্রয়োজন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজভাষাকে নিয়ে সারা দেশকে একযোগে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই ভাষার মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে একটা মজবুত সম্পর্ক গড়ে উঠে, যার মাহাত্ম্য অনেক। এই প্রয়াসে হিন্দির ভূমিকা সবসময় উল্লেখযোগ্য। আমি মনে করি সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সমস্ত নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে সবাই সমান সুযোগ সুবিধা লাভে সমর্থ হন। ভারতবর্ষ বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের দেশ। হিন্দি বিশ্বের সবচেয়ে বড় লোকতন্ত্র ভাষা। আর বিবিধতার মধ্যে ঐক্য নিয়ে আসে। স্বাধীন স্থানীয় ভাষার সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রভাষা হিন্দির প্রসার ঘটাতে হবে। হিন্দি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম তৃতীয় ভাষা যার মাধ্যমে কথা বলা হয়। ভাষার মূল লক্ষ্য মানুষকে সংযুক্ত করা, বিভক্ত করা নয়। এটি আমাদের চিন্তাভাবনা এবং উত্তর পূর্বের চিন্তাভাবনাও। জাতীয় ভাষাকে প্রসার করা উচিত এবং এর সাথে স্থানীয় ভাষাগুলিরও উন্নতি করা উচিত। কারণ এটা আমাদের দেশের শক্তিও।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতের জাগরণের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। ইংরেজিতে, প্রায় ১০,০০০ শব্দ রয়েছে, যেখানে হিন্দিতে ২.৫ লক্ষের বেশি শব্দ রয়েছে। আমরা সকলেই জানি যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর অধীনে বিভিন্ন ভাষার বিকাশ ও অনুশীলনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি মাতৃভাষাকে স্কুলে পড়াশোনার মাধ্যম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক স্কুলে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষাও দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাষা আমাদের পরিচয় ও প্রাণ। ত্রিপুরায় হিন্দি বলার প্রচলন বেড়েছে। হিন্দিভাষী এবং হিন্দি জানা লোকের সংখ্যাও বেড়েছে।

অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা আরো বলেন, ভারত এক বিশাল ভাষাগত বৈচিত্র্যের দেশ এবং হিন্দি ভাষা হলো সেই বৈচিত্র্যকে একসূত্রে বাঁধার এক অনন্য শক্তিশালী মাধ্যম। আঞ্চলিক ভাষার স্বকীয়তা বজায় রেখে হিন্দির জয়যাত্রা এই দর্শনই হলো ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রাণ শক্তি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হিন্দির প্রসার আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব কমায় না বরং স্থানীয় ভাষা ও হিন্দি দুটির সহাবস্থানই জাতীয় ঐক্যের শক্ত ভিত্তি। রাজ্যের বর্তমান সরকারও আঞ্চলিক ও জনজাতির ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশে আন্তরিক। হিন্দি ভাষার শব্দভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি ভাব প্রকাশের জন্য শত শত শব্দ বিদ্যমান। সংস্কৃতের ঐশ্বর্যপূর্ণ শব্দভান্ডার ও নতুন শব্দ সৃষ্টির ক্ষমতা হিন্দিকে সমৃদ্ধ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভাষার উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি করা, বিভক্ত করা নয়।

মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, রাষ্ট্রভাষার ব্যবহারকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ বিশেষ সহায়ক হবে। নতুন প্রেরণা ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলনে উপস্থিত অতিথিদের ত্রিপুরার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সম্মেলনের সার্বিক সফলতা কামনা করেন।

সম্মেলনে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বন্দি সঞ্জয় কুমার, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, সাংসদ কৃতি সিং দেববর্মা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ রাজভাষা বিভাগের সচিব অংশুলি আর্য, ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মিলন রাণী জমাতিয়া সহ অন্যান্য মন্ত্রী, বিধায়ক, জনপ্রতিনিধি ও পদস্থ আধিকারিকগণ।

উল্লেখ্য, এই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কার্যালয়ের আধিকারিকগণ, পিএসইউ, বিভিন্ন ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা সহ ৩ হাজারেরও অধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। রাজভাষা সম্মেলনে দেশের পূর্ব অঞ্চলের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের ৮টি রাজ্য এবং উত্তর অঞ্চলের উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ থেকে প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।

Leave a Reply